দোঁহা

শিশির আজমের গুচ্ছ কবিতা

 

কালিনিনগ্রাদ 

শেষমেশ এমন একটা মেয়েকে আমি ভালবাসতে গেলাম যে থাকে কালিনিনগ্রাদ। কালিনিনগ্রাদ কোথায় জানো তো? পোল্যান্ড আর লিথুয়ানিয়ার উত্তর-দক্ষিণ কোণটায়, বাল্টিক সাগরের কূল ঘেঁষে। অর্থাৎ মূল রুশ ভূখন্ড থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব। আর জার্মানদের অপরিমেয় লোভলালসা আর ইতিহাসের অস্বস্তিকর গণগণে করিডোর ওটা। 'কিন্তু আমি খাঁটি রুশি', বললো নাতাশা। নাতাশা, আমার প্রেমিকা, যে এখন থাকে কালিনিনগ্রাদ। হ্যা, কালিনিনগ্রাদেই ওর জন্ম, অর্থাৎ কালিনিনগ্রাদের ভূমিকন্যা। অবশ্য নিজেকে ও কখনও কখনও সাইবেরিয়ান নুথাচ হিসেবে দাবী করে। কেন না নু্থাচ পাখির কাছে এই দূরত্ব কিছুই না। কালিনিনগ্রাদ, প্রথম দেখাতেই কেউ প্রেমে পড়ে যাবে এরমকম কোন জায়গা নিশ্চয় না। কিন্তু এর উষ্ণ জলের বন্দর, মনোরম আর মনকাড়া সব প্রাকৃতিক দৃশ্য রয়েছে - তদুপরি এর গাছপালা আর বসতবাড়ি আর ধুলোবালিতে কত যে কাহিনী উড়ে বেড়ায়! সবাই দেখতে পায় না হয় তো। যা হোক আমি চাই কালিনিনগ্রাদ গিয়ে থাকতে। আর এটা আমাদের দু'জনের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ, এমন আশঙ্কা নাতাশার। কিন্তু আমি ন্যাটোপ্রধানের কাছ থেকে তো সুপারিশপত্র নিতে যাচ্ছি না।

 

পিটার্সবুর্গের ড্রাগন

সমুদ্রের জানালার দরকার হয় না। কে জানতো  চুরি করা সূর্যটা শাসক হয়ে উঠবে।
পিটার্সবুর্গে আমি দেখেছি নীল আলোর কুর্সিতে
জেদি শামুকের আর্তি, তার পাশে অগভীর শীতের ড্রাগন।

জঙ্গলের নীরবতাকে পাঠানো উচিৎ খনিজ বিজ্ঞান টন্সটিটিউটে।
সূর্যের অস্থিরতাকে স্বাধীন স্বচ্ছ এক চামচে তুলে আনা যেত
জমে যাওয়া নেলপালিশের পিরিচে।

পারিবারিক গল্প ছাড়াই জানালাগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে, জীকাশ্ম আগুনে
একটি জানালা নিজেকে ধুয়ে নিচ্ছে।
আলো আসুক ভিজে তোশকের তলে, কালো পোকাদের পরিবারে।

আজ অসুস্থ তেলাপোকার জন্মদিন।
লোহার বিশাল ট্রেন, ভারী। জানালা থাকুক, না থাকতে চাইলে
ওর ছাতিমফুলেই আমরা সন্ধে করবো।

 

ট্রেন মিস 

এইমাত্র
এই সাতসকালে ট্রেনটা চলে গেল
আমি স্টেশনে পৌছাবার আগ মুহূর্তে

এটা কি ঠিক

ওর তো লজ্জিত হওয়া উচিৎ
ওই ট্রেনের
 

সারারাত দু-চোখের পাতা আমি এক করিনি
ওর কথা ভেবে
আর ও কি না চলে গেল
একটু অপেক্ষা না করে
পেছনে
একবারও না তাকিয়ে 

 

আফ্রিকা

আফ্রিকা এমন এক মহাদেশ যেখানে সবাই কালো
অর্থাৎ যারা কালো তারা আফ্রিকান
আমরাও তো কালো
আর কিছুটা বাদামী
আর কিছুটা সাদা
তাহলে আমরা কি আফ্রিকান হিসেকে নিজেদেরকে দাবী করতে পারবো
কিন্তু এই বিদঘুটে ব্যাপারটা ঘটালো কে
মানে আমরা না সাদা
না কালো
না পিওর বাদামী
আর এসব নিয়ে গাদা গাদা বই লিখলো কারা আর সিনেমা বানালো
আর ভাস্কর্য আর সেমিনার
আর কালো বলতে কি কেবল চামড়াই কালো
আমাদের ভাষাও তো কালো
হাসি কালো
নদী কালো
সূর্য কালো
খিদে কালো
অশ্রু কালো
রক্ত কালো
হ্যা আজ অব্দি আমাদের রক্তও কালো
দেখে নাও
তাহলে আমরা কেন আফ্রিকান হবো না

 

কাবুল বিমান বন্দর 

এটা একটা সুড়ঙ্গ
এটা দিয়ে তোমরা পালাতে পারবা হয় তো

কিন্তু এটা এতো সরু আর অন্ধকারাচ্ছন্ন
যে
সবাইকে নিতেও পারবে না

তো সবাই সুড়ঙ্গের দিকে ছোটেনি
কেউ কেউ
নিজের ভেতর সুড়ঙ্গ তৈরি করে নিয়েছে
আর
অপেক্ষা করছে




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

মোট পৃষ্ঠাদর্শন