নার্গিস পারভিন
হিরোশিমার আগুন এখনো নেভেনি
পারমাণবিক যুগ থেকে হাইপারসনিক বিশ্বের পথে মানবসভ্যতার আত্মজিজ্ঞাসা
"The unleashed power of the atom has changed everything save our modes of thinking."
—Albert Einstein
"পরমাণুর মুক্ত শক্তি সবকিছু বদলে দিয়েছে, শুধু মানুষের চিন্তার ধরনটিই বদলাতে পারেনি।"
পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; তারা হয়ে ওঠে মানবসভ্যতার ভাগ্যরেখা। তেমনি একটি তারিখ ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। সেই দিনটি শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি সামরিক ঘটনা নয়; সেটি ছিল মানুষের আত্মপরিচয়ের ইতিহাসে এক নির্মম মোড়। সেদিন পৃথিবী প্রথম উপলব্ধি করেছিল—মানুষ এমন এক শক্তির অধিকারী হয়েছে, যা এক মুহূর্তে একটি নগরকে নয়, সমগ্র সভ্যতার ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে। পারমাণবিক বিস্ফোরণের কয়েক সপ্তাহ আগে নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষার সাক্ষী ছিলেন সেই প্রকল্পের পরিচালক বিজ্ঞানী J. Robert Oppenheimer, বহু বছর পরে সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর মনে পড়েছিল ভগবদ্গীতার এক শ্লোক—
"Now I am become Death, the destroyer of worlds."
(— Bhagavad Gita (11:32)
Oppenheimer-এর স্মৃতিচারণে)
সেদিন সকালেও হিরোশিমা ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। রাস্তায় ট্রাম চলছিল, শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, দোকান-বাজার সচল হচ্ছিল, হাসপাতালের চিকিৎসকেরা দিনের কাজ শুরু করছিলেন। কেউ ভাবতেই পারেনি, কয়েক মিনিট পরে চোখ ঝলসানো এক কৃত্রিম আলোর ঝলকানি তাদের জীবনকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডির অংশ করে তুলবে।
সকাল ৮টা বেজে ১৫ মিনিট।
আকাশ থেকে নেমে এল একটি বোমা—Little Boy। নামটি ছিল নিরীহ, কিন্তু তার অন্তরে লুকিয়ে ছিল মানবসভ্যতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর শক্তি। এক মুহূর্তের সাদা আলোকচ্ছটা, তারপর অসহনীয় তাপ, অগ্নিঝড়, বিস্ফোরণ এবং মৃত্যুর এক অবর্ণনীয় নীরবতা। মানুষ ছায়ায় পরিণত হলো, গোটা একটা শহর ধূলিসাৎ হয়ে গেল, নদী ভরে উঠল দগ্ধ মানুষের আর্তনাদে। তিন দিন পরে নাগাসাকির ভাগ্যও ভিন্ন হলো না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসংখ্য শহর ধ্বংস হয়েছে। ড্রেসডেন পুড়েছে অগ্নিবর্ষণে, স্ট্যালিনগ্রাদ বিধ্বস্ত হয়েছে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। কিন্তু হিরোশিমা ও নাগাসাকি এক ভিন্ন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। সেখানে ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এমন এক প্রযুক্তি, যা প্রথমবার সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। সেই পারমাণবিক বিস্ফোরণের ভয়াবহতা বিস্ফোরণের মুহূর্তে শেষ হয়নি। যাঁরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন তেজস্ক্রিয় বিকিরণের অভিশাপ বহন করেছেন। ক্যানসার, রক্তরোগ, জন্মগত শারীরিক জটিলতা—মৃত্যু যেন বিস্ফোরণের পরও বছরের পর বছর মানুষের শরীরের ভেতর নীরবে কাজ করে গেছে। দীর্ঘকালীন চলা দ্বিতীয় যুদ্ধও এক সময় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল, কিন্তু হিরোশিমা-নাগাসাকির মানুষদের যন্ত্রণার কোনো বিরতি হয়নি। জাপান একটা নতুন শব্দ সৃষ্টি করেছিল—হিবাকুশা। অর্থাৎ, যারা পারমাণবিক বিস্ফোরণের শিকার হয়েও বেঁচে ছিলেন। এই শব্দটি শুধু একটি পরিচয় নয়; এটি মানবসভ্যতার বিবেকের অভিধানে লেখা এক স্থায়ী ক্ষত। কারণ হিবাকুশাদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের প্রকৃত সমাপ্তি কোনো শান্তিচুক্তিতে হয় না; যুদ্ধ শেষ হয় তখনই, যখন তার শেষ আর্তনাদটিও নিঃশেষ হয়ে যায়। আর সেই আর্তনাদ অনেক সময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে।
বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল একবার লিখেছিলেন—
"Remember your humanity, and forget the rest."
"নিজের মানবতাকে স্মরণ করো, বাকিটা ভুলে যাও।"
হিরোশিমার ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়ালে এই বাক্যটির গভীরতা নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। কারণ সেখানে গিয়ে বোঝা যায় জাতীয়তা, ধর্ম, ভাষা কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ—সবকিছুর ওপরে একটি পরিচয় আছে, সেটি হলো মানুষ। তবু ইতিহাসের নির্মমতা এখানেই যে, মানুষ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে, কিন্তু স্মৃতির শিক্ষা সবসময় গ্রহণ করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবী ঘোষণা করেছিল—এমন বিপর্যয় আর কখনও ঘটতে দেওয়া হবে না। কিন্তু যুদ্ধ থামলেও অস্ত্রের প্রতিযোগিতা থামেনি। বরং পৃথিবী প্রবেশ করল এক নতুন যুগে—পারমাণবিক প্রতিরোধের যুগে, যেখানে শান্তির ভিত্তি হয়ে উঠল পারস্পরিক ধ্বংসের ভয়। সভ্যতা এমন এক অদ্ভুত সমীকরণ মেনে নিল, যেখানে অস্ত্র যত বাড়বে, নিরাপত্তাও নাকি তত বাড়বে।
কিন্তু সত্যিই কি তাই?
মানুষ মঙ্গলগ্রহে মহাকাশযান পাঠিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ভাষায় কথা বলছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান অসম্ভবকে সম্ভব করছে। সেসব যেমন ঘটছে ঠিক তেমনই হিরোশিমা-নাগাসাকি ধ্বংসের আট দশক পরেও আমরা দেখি, একই মানুষ এমন অস্ত্রও তৈরি করছে, যা কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি সভ্যতার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে দিতে পারে! মনেহয়, প্রযুক্তি এগিয়েছে আলোর গতিতে; কিন্তু মানুষের বিবেক যেন হাঁটছে অতি ধীর পদক্ষেপে! এখানেই হিরোশিমা কেবল অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকে না। সে পরিণত হয় বর্তমানের এক নীরব প্রশ্নে। আমরা কি সত্যিই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছি?
যুদ্ধের স্বরূপ বদলেছে, কিন্তু আগুনের রং বদলায়নি
ইতিহাস কখনোই হুবহু ফিরে আসে না। সে নতুন পোশাক পরে আসে, নতুন ভাষায় কথা বলে, নতুন প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়। তাই আজকের পৃথিবীতে আমরা হয়তো হিরোশিমার আকাশে দেখা সেই অগ্নিগোলক দেখি না; কিন্তু প্রতিদিনই যুদ্ধের নতুন মুখের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হচ্ছে। ধ্বংসের প্রযুক্তি পাল্টেছে, কিন্তু ধ্বংসের দর্শন খুব বেশি পাল্টায়নি। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, বিশ্বায়ন হয়তো যুদ্ধের সম্ভাবনা কমিয়ে দেবে। যখন পৃথিবীর অর্থনীতি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হবে, যখন একটি দেশের শিল্প অন্য দেশের কাঁচামালের ওপর দাঁড়াবে, যখন প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সীমান্তকে অতিক্রম করবে, তখন যুদ্ধের পরিবর্তে সহযোগিতাই হবে সভ্যতার নতুন ভাষা। তিক্ত বাস্তবতা এই যে সেই আশা সত্য হয়নি। গত কয়েক বছরে পৃথিবী এমন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে যুদ্ধ আর দূরের কোনো খবর নয়; প্রতিদিনের বাস্তবতা। ইউরোপে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দেখিয়েছে, ইতিহাসের পুরোনো ক্ষত কত সহজে আবার রক্তাক্ত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রমাণ করেছে, একটি আঞ্চলিক উত্তেজনা কত দ্রুত বৈশ্বিক উদ্বেগে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে উত্তেজনা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে, তা কেবল কয়েকটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সংঘর্ষ নয়; বরং সমগ্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার একটি স্পষ্ট স্মারক। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের অবস্থান, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং আন্তর্জাতিক জোটের পরিবর্তিত সমীকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রত্যেক রাষ্ট্র তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করে—এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সীমান্ত ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ে। আমরা গত কয়েক মাসে নিজের চোখেই দেখেছি—যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ে, জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে যুদ্ধ থাকে, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি শোনা যায় সাধারণ মানুষের সংসারেও। এই বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। মানচিত্রে এটি একটি সরু জলপথ মাত্র। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার কাছে এটি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ প্রতিদিন এই প্রণালি অতিক্রম করে বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে নাড়া দিতে পারে। যদি কোনো সংঘাতের কারণে এই পথ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়, তবে তার প্রভাব শুধু তেল আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে, পরিবহনব্যবস্থার ব্যয় বাড়বে, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে, মূল্যস্ফীতি নতুন করে মাথাচাড়া দেবে। যুদ্ধ তখন আর কেবল মরুভূমির বালুকণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; তার ছায়া পৌঁছে যাবে পৃথিবীর অগণিত সাধারণ পরিবারের রান্নাঘর পর্যন্ত। এই দৃশ্য আমরা কেবল কল্পনা করছি না; গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের দেখিয়েছে, আধুনিক পৃথিবীতে একটি সংঘাত কত দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। আজকের পৃথিবী এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত যে একটি দেশের সংকট আর এক দেশের একার সংকট থাকে না। সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি, প্রযুক্তি, আর্থিক বাজার—সবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা। সেই সুতোয় একটি টান পড়লেই তার কম্পন অনুভূত হয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এই কারণেই আজ যুদ্ধের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। একসময় যুদ্ধ মানে ছিল সীমান্তে সৈন্য, কামান আর ট্যাঙ্ক। এখন যুদ্ধ মানে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সাইবার আক্রমণ, ড্রোন, তথ্যযুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয়।
একটি ক্ষেপণাস্ত্র হয়তো একটি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত করে, কিন্তু তার অভিঘাত পৌঁছে যায় সেই মানুষটির জীবনেও, যিনি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে শুধু সংসারের খরচ সামলানোর চেষ্টা করছেন। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট পৃথিবী প্রথম শিখেছিল—একটি বোমা একটি শহরকে ধ্বংস করতে পারে। ২০২৬ সালের পৃথিবী আমাদের শিখিয়েছে—একটি যুদ্ধ সমগ্র বিশ্বের জীবনযাত্রাকে বদলে দিতে পারে। তবু আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এখনো বাকি। একসময় রাষ্ট্রগুলোর হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত সময় ছিল। কূটনীতি ব্যর্থ হলে যুদ্ধ শুরু হতো, আর যুদ্ধ শুরু হলেও আলোচনার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যেত না। কিন্তু প্রযুক্তি সেই সময়কে ক্রমশ সংকুচিত করে দিচ্ছে। এমন এক যুগের দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি, যেখানে একটি ভুল সংকেত, একটি ভুল হিসাব কিংবা একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই নতুন যুগের প্রতীক—হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র! আর এই কারণেই পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা আজও উদ্বেগের সঙ্গে তাকিয়ে থাকেন আরেকটি প্রতীকের দিকে—ডুমসডে ক্লকের কাঁটার দিকে। কারণ প্রশ্নটি আর শুধু এই নয় যে মানুষ কত শক্তিশালী অস্ত্র তৈরি করেছে।প্রশ্নটি হলো—মানুষ কি নিজের তৈরি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রজ্ঞাও অর্জন করেছে?
আগুনের পরে যে আলো থাকে
মানুষের ইতিহাসে কিছু প্রতীক আছে, যা কেবল একটি সময়কে নয়, একটি সভ্যতার মানসিক অবস্থাকেও প্রকাশ করে। ডুমসডে ক্লক তেমনই একটি প্রতীক। এটি কোনো সাধারণ ঘড়ি নয়; এটি মানুষের আত্মসমালোচনার প্রতীক। প্রতি বছর পৃথিবীর বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা এই ঘড়ির কাঁটার অবস্থান নির্ধারণ করেন। যখন পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ে, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, কিংবা মানবসভ্যতার অস্তিত্ব নতুন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন এই ঘড়ির কাঁটা প্রতীকীভাবে মধ্যরাতের দিকে এগিয়ে যায়। সেই মধ্যরাত কোনো সময় নয়। সেটি মানবসভ্যতার সম্ভাব্য আত্মবিনাশের রূপক। এই ঘড়ি আমাদের ভয় দেখায় না; আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে।
মানুষ কি তার বুদ্ধিমত্তাকে অতিক্রম করে তার ধ্বংসের ক্ষমতা বাড়িয়ে ফেলছে?
প্রশ্নটা ক্রমশ আরও জরুরি হয়ে উঠছে। কারণ পৃথিবী এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে যুদ্ধের গতিও প্রযুক্তির গতির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। শব্দের গতির বহু গুণ দ্রুতগামী হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও এর রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা এবং সাইবার প্রযুক্তি। ফলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু শক্তির নয়, সময়েরও যুদ্ধ। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মানুষের হাতে যে সামান্য অবকাশ একসময় ছিল, প্রযুক্তি সেই সময়কেও ক্রমশ সংকুচিত করে দিচ্ছে। তবে এ দায় কি প্রযুক্তির? আমরা কি আবার সেই প্রশ্নের সম্মুখে এসে দাঁড়াচ্ছি- বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ? একই বিজ্ঞান ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার করতে পারে, আবার সেই বিজ্ঞানই পারমাণবিক বোমাও নির্মাণ করতে পারে। বিজ্ঞান শক্তি দেয়, কিন্তু সেই শক্তি কোন পথে ব্যবহৃত হবে, তার সিদ্ধান্ত নেয় মানুষের বিবেক। তাই সংকট প্রযুক্তির নয়; সংকট মানুষের প্রজ্ঞা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের। এই কারণেই হিরোশিমা কেবল অতীতের একটি ট্র্যাজেডি নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রতি একটি সতর্কবার্তা। আমরা প্রায়ই মনে করি, যুদ্ধ মানে বন্দুকের গর্জন, ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ কিংবা ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া আকাশ। কিন্তু যুদ্ধের আরও একটি মুখ আছে—যেটি অনেক নীরব। সেই মুখটি দেখা যায় উদ্বাস্তু শিবিরে। সেই মুখটি দেখা যায় হাসপাতালে। সেই মুখটি দেখা যায় যুদ্ধপীড়িত একটি শিশুর চোখে, যে জানেই না কেন তার বাড়ি আর নেই। যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সেনাপতিরা লেখেন না; লেখেন সাধারণ মানুষ। যে কৃষক তার জমি হারিয়েছেন, যে মা সন্তানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন, যে শিশু জন্মের আগেই যুদ্ধের উত্তরাধিকার পেয়েছে—ইতিহাসের সবচেয়ে সত্য অধ্যায় তাদের জীবনেই লেখা থাকে। হয়তো এ কারণেই হিরোশিমা আজও পৃথিবীর কাছে প্রাসঙ্গিক। কারণ সেখানে দাঁড়ালে বোঝা যায়, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরাজিত কোনো রাষ্ট্র নয়—মানুষ!
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হচ্ছে। সামরিক খাতে বাজেট বাড়ছে। প্রযুক্তি প্রতিদিন আরও উন্নত হচ্ছে। কিন্তু একই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ এখনো খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং নিরাপদ জীবনের জন্য সংগ্রাম করছে। এই বৈপরীত্য আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব অস্ত্রাগারের আকারে নয়; মানুষের জীবনের মর্যাদায়। হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কে একটি অনির্বাণ শিখা জ্বলছে। সেই শিখা কোনো বিজয়ের প্রতীক নয়। সেটি কোনো প্রতিশোধের প্রতীকও নয়। সেটি স্মৃতির প্রতীক। প্রতিজ্ঞার প্রতীক। মানবতার প্রতীক। বিশ্বজুড়ে যতদিন পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে, ততদিন সেই শিখা জ্বলবে। এই দৃশ্যের মধ্যে এক গভীর প্রতীক লুকিয়ে আছে। ১৯৪৫ সালের আগুন ছিল ধ্বংসের আগুন। আজকের সেই অনির্বাণ শিখা স্মৃতির আগুন। একটি আগুন মানুষকে হত্যা করেছিল। অন্য আগুন মানুষকে সতর্ক করে। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—এই দুই আগুনের মধ্যে আমরা কোনটিকে বেছে নিই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন—"মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।"
এই একটি বাক্য হয়তো হিরোশিমার ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও নতুন অর্থ খুঁজে পায়। কারণ যদি মানুষের ওপর বিশ্বাসই হারিয়ে যায়, তবে শান্তির সমস্ত প্রচেষ্টাই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই হিরোশিমাকে স্মরণ করা মানে কেবল অতীতকে স্মরণ করা নয়। হিরোশিমাকে স্মরণ করা মানে বর্তমানকে প্রশ্ন করা। আর ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্ব স্বীকার করা। আমরা যদি সত্যিই হিরোশিমাকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তবে শুধু স্মৃতিস্তম্ভে ফুল অর্পণ করলেই হবে না। আমাদের এমন এক পৃথিবী গড়তে হবে, যেখানে বিজ্ঞান মানুষের জীবন রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হবে, ধ্বংসের জন্য নয়; যেখানে কূটনীতি যুদ্ধের প্রয়োজনে নয়, যুদ্ধের পরিবর্তে কাজ করবে; যেখানে শক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ হবে সংযমে, প্রতিশোধে নয়। হিরোশিমার আগুন অনেক আগেই নিভে গেছে। কিন্তু সেই আগুনের আলো এখনো পৃথিবীর বিবেককে আলোকিত করতে পারে। শর্ত একটাই—আমরা যেন সেই আলোর দিকে তাকিয়ে থাকার সাহস না হারাই। কারণ ইতিহাসের শেষ কথা কোনো বোমা লেখে না। কোনো ক্ষেপণাস্ত্রও নয়। ইতিহাসের শেষ কথা লেখে মানুষ।
নির্বাচিত তথ্যসূত্র
Albert Einstein, The Real Problem Is in the Hearts of Men (1946)
Bertrand Russell and Albert Einstein, The Russell–Einstein Manifesto (1955)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সভ্যতার সংকট
Richard Rhodes, The Making of the Atomic Bomb (1986)
Bulletin of the Atomic Scientists (Doomsday Clock)
Hiroshima Peace Memorial Museum
