দোঁহা

সারাৎসার

 


অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 

গুলি ফুরিয়ে গিয়েছে। দুইজনেরই খালি ম্যাগাজিন এখন। ধ্বংসস্তুপের দুইপাশ থেকে, আড়াল সরিয়ে দুইজনেই এখন বুঝি বা পরস্পর পরস্পরের সম্মুখে এসে দাঁড়াতে পারে। গুলি খেয়ে মরে যাবারও ভয় কেটে গিয়েছে। দুইজনেরই খালি ম্যাগাজিন এখন। তাই পায়ে পায়ে আড়াল সরিয়ে ওরা বেরিয়ে এসেছে। মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, ওরা দুইজনেই।

 

এই জায়গাটার কোনও ঠিকানা নেই। অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশের বিচারে এই জায়গাটাকে পৃথিবীর মানচিত্রে সঠিক করে কোথাও খুঁজে পাবারও কোনও উপায় নেই। আদিগন্তবিস্তৃত এক পোড়ো খাঁ খাঁ জমির ঠিক মাঝবরাবরটিতেই এই রচনাংশের আখ্যান আরম্ভ।

 

...এর কোনও সূচনা নেই। কোনও অবশেষও নেই বোধহয়। কেবল কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে স্তিমিত হয়ে আসা এয়ার রেইড সাইরেনের আওয়াজ। মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে ওরা দুইজনেই।

 

হাইফা ওর মুখ থেকে কালো মুখোশটাকে টেনে খুলে ফেলল। মাথার টুপিটাকে সরিয়ে দিতেই একরাশ সোনালী চুলের ভার উপচে নেমে এল প্রায় কোমরের কাছ অবধি। ওপাশের মানুষটিও হতভম্ব হয়ে হাইফার এই কাণ্ডকে অবাক চোখে জরিপ করে নিচ্ছিল। শেষ অবধি মুখোশ খুলে নিল সেও, ঝকঝকে নীল চোখে হাইফারই দিকে তাকাল। “আমি দিমিত্রি,” পিঠ থেকে মেশিনগান নামিয়ে হাতটাকে সেও বাড়িয়ে ধরল, হাইফার অভিমুখেই। ক্লান্ত দুখানি হাত পরস্পরের আঙুলগুলোকে তৃষ্ণার্ত উটপাখির মতোই প্রবল এক আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা নিয়ে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছিল। দুইপক্ষের কমাণ্ডিং অফিসারেরা এই বিশ্বাসঘাতকতার হদিস জানতে পেল না। ওদের মাঝখান দিয়ে বরফগলা জলের এক পুষ্ট ধারাস্রোত বয়ে গিয়েছিল। ওরা সেই শীতল নালাটুকুর জলে পা ডুবুতে ডুবুতেই পরস্পর পরস্পরের দিকে এগিয়ে এসেছিল। দিনশেষের ক্লান্তিকে চুকিয়ে দিতে চেয়েছিল সেই স্রোতের বহমানতাতেই।

 

 

পাশাপাশি ওরা হেঁটে যাচ্ছিল দুইজনেরই পিঠে বন্দুকরুকস্যাক আরও টুকিটাকি জিনিসওরা আশ্রয়ের খোঁজে হেঁটে যাচ্ছিল দিমিত্রিই প্রথম কথা বলল

 

-“কতদিন হলো ফ্রন্টলাইনে এসেছ?”

-“একমাসের উপর হয়ে গিয়েছে

-“তার আগে কি করতে?”

-“ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের এ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলাম পূর্ণসময়ের কাজ

-“ভালো লাগত?”

 

হাইফা অবাক হয়ে তাকায়, “এই পরিস্থিতির চেয়ে তো বটেই কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন?”

 

-“না, হঠাৎই মনে হলো আমার তোমাকে ঠিক কম্পিউটারের উলটো দিকে বসে ঘাড় গুঁজে কাজ করে যেতে দেখলে, জানি না” দিমিত্রি চুপ করে গেল, “ও কথা থাক

-“শুনিই নাআমাকে কোন কাজের জন্যই বা উপযুক্ত বলে মনে করো তু্মি?”

-“নাএমনিই,” দিমিত্রি একবার জিভ বের করে ঠোঁটটাকে ভিজিয়ে নেয়, “তোমাকে দেখলে মনে হতে পারে আর্টিস্টনয়তো বা গান করোগির্জাতে কয়্যারে গলা মেলাও

 

হাইফা হেসে ফেলে দিমিত্রি আবারও জিজ্ঞেস করে, “আর কেউ ছিল বুঝিজীবনে তোমার?”

 

সামান্য এইটুকু প্রশ্নতেই হাইফার মুখের চেহারাটা হঠাৎ কেমন যেন বদলিয়ে যায় পিঠ থেকে রুকস্যাক আর বন্দুকটাকে কোনও মতে জমির উপরে ফেলে দিয়েই, হঠাৎ করে যেন এক অব্যক্ত রাগ আর জিঘাংসা নিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে দিমিত্রির উপর রাগটাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি

 

আকস্মিক এই আক্রমণে দিমিত্রিও চমকিয়ে যায় প্রথম আঘাতেই কোনওক্রমে পিছু হটতে গিয়ে সটান সেও পড়ে যায় বরফের উপরহাইফা একনাগাড়ে ওর বুকের উপরে চেপে বসে মুখের উপরে ঘুষির পরে ঘুষি চালাতে থাকে “আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিকেন বাঁচিয়ে রেখেছি!” বিড়বিড় করে সে বলে যেতে থাকে কোনওক্রমে একসময় দিমিত্রি ওর হাতদুটোকে ধরে ফেলে

 

হাইফার বন্ধু জোসেফও স্বেচ্ছায় এই কনস্ক্রিপশনে যোগ দিয়েছিল সপ্তাহখানেক আগেই মাত্র মিসাইলের এক অতর্কিত আক্রমণ ...

 

ওরা দুইজনে আবারও হেঁটে যেতে থাকেদিমিত্রির ঠোঁট ফেটে গিয়েছে হাইফারও জামার উপরে কাঁধের কাছটাতে বড় একটা অংশ ছিঁড়ে এসেছে একফালি এতটুকু হলেওএকচিলতে আশ্রয় প্রয়োজন এখনরাত হয়ে এসেছে এই ঠাণ্ডার মধ্যে আরও একটা রাত যদি এভাবে খোলা আকাশের নীচে বিনা আশ্রয়ে কাটাতে হয়নির্ঘাৎ মারা পড়বে ওরা দুইজনেই যতক্ষণ অবধি গোলাগুলি মারামারি ইত্যাদি চলছিলততক্ষণ অবধিও কারোর মনে হয়নি এসব এখন যে একটা মাথা গোঁজবার মতো ঠাঁই না জুটলেই নয় মানুষের শরীর ও মন বড় অদ্ভুৎ চালে কাজ করে বড় অসহায় করে দেয় একেকটা সময় গোধূলির আলোয়সেই বরফঠাণ্ডা পৃথিবীতে ওরা দুইজনেই পাশাপাশি হেঁটে যেতে থাকে

 

 

রাত ঘরের মাঝখানটাতে প্রায় ভেঙে আসা ফায়ারপ্লেসটাকে ঘিরেই ওরা চারজনে বসেছিল চারজন মানুষ। দিমিত্রিহাইফা ও আরও দুইজনযারা কোনওভাবেই এই যুদ্ধের সময় এই এলাকাকে ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেনি নাতাশা ও গ্রেগরি দুজনেই গরীবদুজনেই অথর্ব একজন বয়সের কারণেঅন্যজন...

 

২০১৪তে যুদ্ধের সময় গ্রেগরির পায়ে বোমার স্প্লিন্টার এসে বিঁধেছিল দুটো পাকেই হাঁটুর নীচ থেকে কেটে বাদ দিতে হয়েছিল কাজেই হুইলচেয়ার ভিন্ন গ্রেগরিরও নড়াচড়ার উপায় নেই আর নাতাশার বয়স সত্তর পেরিয়েছেকাজেই সন্তানের মুখ চেয়ে বসে থাকা ভিন্ন তারও আর কোনও বিকল্প নেই ছোট ছোট এমনই একেকটা ছবিতেযেন বা মানবতাকেই তখন...

 

এদিকে জ্বলজ্বলে হয়ে উঠতে থাকা সেই আগুনের শিখাটুকুইহাইফাদের মুখের উপরে এসে পড়ে হঠাৎ রাত বাড়ছে দিমিত্রি আর গ্রেগরির মধ্যেকার আলাপ ততক্ষণে জমে উঠেছিল

 

-“২০০৭না ২০০৮ বোধহয়,” উল্লসিত গ্রেগরির গলা শোনা যাচ্ছিল, “মস্কোর দল সেবারে কিইভে খেলতে এসেছিল আমরা সক্কলে মিলে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম -২ গোলে হারিয়ে দিয়েছিলাম ব্যাটাদের ওফএকটা খেলার মতো খেলা হয়েছিল বটে সেবার!”

-“হ্যাঃওই একবারই তো মুরোদ হয়েছিল হারানোর তারপর থেকে তো আর খেলতেই গেল না তোমাদের দল দম আছে বুঝতাম যদি বা মস্কোতে এসে খেলে দেখাতে পারতে” দিমিত্রি জবাব দেয়

-“যাব না সেটা বলেছিলাম কখনতোমাদের প্রেসিডেন্টই তো আর ভরসা করে আমাদেরকে ডাকলে না


-“প্রেসিডেন্টগুলো ওইরকমই হয়,” সামনে রাখা কফির মগটাকে তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিতে দিতে দিমিত্রি বলে ওঠে খাবার বলতে শুকনো পাঁউরুটি আর কফি ভিন্ন কিছুই জোটেনি তাই যেন অমৃত গ্রেগরিও হাত বাড়ায় হাইফা আর নাতাশা এদিকটায় সরে এসেছে নাতাশা কম কথার মানুষ এতক্ষণ হয়ে গিয়েছেছোটখাটো হ্যাঁ-হুঁ-না-আচ্ছা ভিন্ন আর কেউই তাকে কোনও কিছু বলতে শোনেনি হাইফা ভাবল একবার তার হাতের উপরে হাত রাখে কিন্তু সাহস জোগাড় করে উঠতে পারে না

 

ভদ্রমহিলা কেমন যেন এক শূন্য দৃষ্টিতেই বাইরের দিকে চেয়ে থাকেন স্বগতোক্তি করেন হঠাৎ, “তোমাদের কপাল ভালো যে আজ বরফ পড়ছে না ছাদের একটা দিক তো একেবারে ধ্বসিয়েই দিয়ে গেছে বর্বরেরা!” নাতাশার শ্বাস পড়ল, “বেজন্মার দল!” অস্ফূটে উনি গালাগালি দিয়ে ওঠেন

 

ওদিকে গ্রেগরি আর দিমিত্রির ফুটবল নিয়ে আলোচনাও তখন ক্রমশ জোরদার থেকে আরোই জোরদার হয়ে উঠেছে ক্লান্তির কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না

 

-“তোমরা কি ঘুমোবে এখন?” নাতাশা এবারে হঠাৎই বলে ওঠেন, “অনেক রাত হয়ে গিয়েছে।” বাকি তিনজনেও এই কথা শুনে নড়ে ওঠে। গল্প করতে করতে সত্যিই সময়ের দিকে কারোর খেয়াল ছিল না। শোয়ার ব্যবস্থা বলতে এই একফালি ঘরের ভিতরটুকুতে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই এখন। নাতাশা জানালেন তিনি ফায়ারপ্লেসের সামনেটায় একটা কাঠের চেয়ারে বসে বসেই রাত কাটিয়ে দেবেন। গ্রেগরিও ঘুমিয়ে নেবে ওর চিরসঙ্গী সেই হুইলচেয়ারটাতেই। সোফা-কাম-খাটের মতো একটা জিনিস রয়েছে, হাইফার জন্য সেটাই বরাদ্দ হয়েছে। দিমিত্রি শোবে মাটিতে। যদিও ভাঙা ছাদের ধ্বংসাবশেষ, পাথর-সিমেন্টের চাবড়াগুলোকে তার জন্য সরিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে খানিক। মাথার উপরে রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে।

 

 

অনেক রাত্তিরে হাইফার ঘুম ভেঙে গেল। মাথার উপরে আকাশটা এখন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে এসেছে। কিন্তু ঘুম ঘুম ভাবটা কাটতে না কাটতেই হাইফা যা দেখল, ওর চোখদুটো একেবারে স্থির হয়ে গেল। সেই আলোআঁধারি আবছায়া অবস্থার মধ্যেও নাতাশা কখন যেন চেয়ার থেকে উঠে পড়ে একেবারে ঘরের ঠিক মাঝখানটিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। ওঁর চোখেমুখে প্রচণ্ড এক জিঘাংসার অনুভূতি। হঠাৎ করেই যেন বা এক অব্যক্ত, প্রচণ্ড হিংসার প্রকাশ ওঁর সমস্ত শরীর জুড়েই তিলে তিলে ফেটে পড়তে শুরু করেছে। অনেক কষ্টে উনি হাতে করে প্রচণ্ড ভারী একটা কংক্রিটের চাবড়াকে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে এগুচ্ছেন। ঘরের মধ্যেটায় দিমিত্রি যে জায়গাটাতে শুয়ে রয়েছে-সেইদিকটাতেই। বিড়বিড় করে উনি যে আপন খেয়ালে কিই বা বলে চলেছেন নাতাশা এতদূর থেকে তা শুনতে বা বুঝতে পারছে না। কিন্তু ইঙ্গিতটা দিনের আলোর চেয়েও স্পষ্ট। নাতাশা আজ প্রতিশোধ নিতে চলেছেন। গ্রেগরির জন্য। গ্রেগরির অকাল-প্রতিবন্ধকতা এক চূড়ান্ত হিংসাত্মক সত্ত্বাকে ওঁর মনের মধ্যে জন্ম দিয়েছে।

 

হাইফা হতবুদ্ধি হয়ে ভাবছিল ওর কিই বা করা উচিত। খুট করে একটা আওয়াজে ঠিক সেই সময় গ্রেগরিরও ঘুম ভেঙে গেল। দিমিত্রিও চোখ খুলে তাকিয়েছে। এরপরের ঘটনাগুলো পলক ফেলতে না ফেলতেই পরপর ঘটে গেল।

 

গ্রেগরি চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল। নাতাশা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। দিমিত্রি অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় ওর হাতের ঠিক পাশ থেকেই আরেকটা সিমেন্টের চাবড়াকে চকিতে তুলে নিয়ে সটান ছুঁড়ে দিল নাতাশার দিকেই। হাইফাও ঠিক তখনই চিৎকার করে উঠে, লাফ দিয়ে ওঁর সামনেটায় এসে পড়ল। সিমেন্টের চাবড়াটা ওর কপাল ছুঁয়ে বেরিয়ে গিয়ে দেওয়ালের উপরটায় ঠক করে একবারটি লেগেই দূরে ছিটকে পড়ল আরও কোথাও। কপালে হাত ছোঁয়াতেই হাইফা অনুভব করল ওর হাতটা চটচটে কোনওকিছুর উপরে গিয়ে পড়েছে। চিনচিনে একটা ব্যথার অনুভূতি। গ্রেগরি চিৎকার করে অসহায়ের মতো অশ্রাব্য কটূক্তিতে ওর মা’কে গালিগালাজ করতে শুরু করেছে।

 

বাহিনীতে যোগ দেওয়ার একমাস এগারো দিন পর – এই প্রথমবারের জন্য হাইফা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

 

 

হাইফার যখন জ্ঞান ফিরল তখন ভালো মতোই সকাল হয়ে গিয়েছে। শুয়েই শুয়েই ও অনুভব করতে পারছিল ওর শরীরের নীচেকার সমস্ত জমিটুকুই যেন বা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। ও চোখ মেলে তাকাল। গ্রেগরি ওর মাথার উপরে মাথা ঝুঁকিয়ে ছিল। চোখ খুলতেই সে বলে উঠল, “উঠো না এখুনি। মা তোমার মাথাটাকে ধুইয়ে ব্যাণ্ডেজ করে দিয়েছেন। চোট বেশী নয়। তবু এখনই উঠতে যেও না। আরেকটু শুয়ে থাকো।” তারপর নিজেই বলল, “শয়তানের বাচ্চারা এবারে ট্যাঙ্ক নিয়ে ঢুকেছে।” হাইফাও ভালো মতোই সেটাকে টের পাচ্ছিল। গ্রেগরির কথা শেষ হতে না হতেই ওদের ঘরের ঠিক সামনেটায় দুড়ুম করে একটা শেল এসে পড়ল। ধোঁয়া আর ধুলোতে চারপাশ ঢেকে গেল। স্প্লিন্টারগুলো শাঁই শাঁই করে এসে বিঁধল দেওয়ালের গা’গুলোয়। এতক্ষণে সে দিমিত্রিকে দেখতে পেল। দরজার একপাশেই দেওয়াল ঘেঁষে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাইফারও সাথে তার চোখে চোখ পড়ল সেই সময়।

 

বাইরে থেকে লাউডস্পিকারে ঘোষণা শুরু হয়েছে তখন,

 

“লিউটেনান্ট কমরেড দিমিত্রি আব্রাহামোভিচ পেস্কভ! তোমাকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, মাথার উপরে দু’হাত তুলে বেরিয়ে আসতে। তুমি যে বিদ্রোহী উগ্রপন্থীদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে এখানকারই কোনও বাড়িতে লুকিয়ে রয়েছ, আমাদের কাছে সে খবর রয়েছে। কাজেই কমরেড পেস্কভ, তোমাকে এখনই মাথার উপরে দু’হাত তুলে বাইরে বেরিয়ে আসতে অনুরোধ করা হচ্ছে। তোমার সঙ্গীদেরকেও সেই একই কাজ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে।” একটু থেমে আবারও ঘোষণা করা হল, “আমরা ঠিক এক মিনিট অপেক্ষা করব। লিউটেনান্ট পেস্কভ তুমি তোমার সঙ্গীদেরকে নিয়ে মাথার উপরে দু’হাত তুলে বেরিয়ে আসবে।” ঘোষণা বন্ধ হয়ে গেল। দিমিত্রি আবারও হাইফারই দিকে তাকায়।

 

সমস্ত পৃথিবীটাই যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। সমস্ত শব্দ থেমে গিয়েছে। সমস্ত প্রাণীই নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছে। দিমিত্রি হাইফার দিকে এগুল। হাইফাও বিছানার উপরে আধশোয়া হয়ে উঠে বসেছে। আকস্মিক এক চুম্বনেও যে এতখানি ভালো লাগা মিশে থাকে...

 

অনাদি অনন্তকাল ধরেই যেন বা তারা তখন, পরস্পর পরস্পরকে ভালবেসেছিল। মিশে গিয়েছিল ওদের ঠোঁটের উপরে ঠোঁট। চিরন্তন...

 

...যে ভালোবাসার মন্ত্র পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধকেই বোধহয়...

 

না, কোনওদিনও থামিয়ে দিতে পারেনি। আমাদেরই ভুল হয়ে যায় কোথাও। যুদ্ধেরা কেবল, কেবলই সেই অনির্দিষ্টকালের কারফিউয়ের মতোই দেশ-দেশান্তর পেরিয়ে জারি থাকে। অনায়াস চলনে নিরবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় তা কেবল চলতেই থাকে বোধহয়। আর কিছু কিছু মানুষ জন্ম পার করেও সেই বোকাদেরই মতো, মিথ্যে মিথ্যে একে অপরকে ভালবাসতে চায়।

 

হাইফা, নাতাশা আর গ্রেগরিকে ট্রাকে তোলা হচ্ছিল। অনির্দিষ্ট এক ঠিকানাহীন ভবিষ্যৎ। দিমিত্রিকে ওদের সামনে থেকেই টানতে টানতে আড়ালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল কোথাও। হাইফার সেই বরফগলা জলের নালাটিকে মনে পড়ছিল। স্বচ্ছ স্ফটিক জল, কোথাও যেন বা কারও স্বপ্নেতেই লাল হয়ে ওঠে হঠাৎ। শিউরে উঠতে হয়...

 

একটা গুলির শব্দ কানে ভেসে এল।

 

হাইফা তাকিয়ে দেখল রাস্তার উপরে পুরনো এক ভাঙাচোরা সাইনবোর্ডের উপর, তাদেরই দেশের সৈনিকেরা রক্তলাল অক্ষরে লিখে দিয়ে গিয়েছে, “বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি মৃত্যু! একমাত্র তাই!”

 

হাইফা ওর দিকে মেশিনগান তাক করে থাকা রক্ষীটার দিকে তাকায়। দিমিত্রিরই মতো যেন বা দেখতে। সমস্তটাই যেন বা কেমন বেভুল-বেঠিক ঠেকতে শুরু করেছে। গ্রেগরি আর নাতাশাকে ট্রাকে তুলে দেওয়া হয়েছে। এবারে হাইফাকেও উঠতে হয়। ট্রাক চলতে শুরু করেছে। ওদেরকে এখনও অনেকটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে...অনেকদূর, অনিশ্চিত এক ঠিকানাহীন ভবিষ্যৎ...



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

মোট পৃষ্ঠাদর্শন