সুদীঘ্ন দাস
১৯২৭ সালে বর্মার মান্দালয় জেল থেকে মুক্তিলাভের পর কলকাতায় ফিরে জাতীয় কংগ্রেসের নানান দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক কাজেও জড়িয়ে পড়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। পরবর্তীকালে এসব সামাজিক কাজের সূত্র ধরেই উত্তর কলকাতার বেশ কিছু বারোয়ারী দুর্গাপুজোর আয়োজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত হন তিনি। যার মধ্যে অন্যতম স্বামী বিবেকানন্দের পাড়ার ঐতিহ্যবাহী সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজো— পরাধীন ভারতবর্ষের বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী নেতার সান্নিধ্যধন্য যে পুজো এবছর কালের নিয়মে একশোর গণ্ডি স্পর্শ করে ফেলল!
আসলে, সুভাষের কাছে দেবী দুর্গার আরাধনা হিন্দুদের নিছক ধর্মীয় অনুষ্ঠানমাত্র ছিল না; বা এতে যে কেবল হিন্দুদেরই অংশগ্রহণ থাকে সেটাও তিনি বিশ্বাস করতেন না, অন্তত তাঁর লেখাপত্র খুঁটিয়ে পড়লে তা বেশ বোঝা যায়। বরং, তিনি মনে করতেন এটা যথার্থ অর্থেই মানুষের মিলনোৎসব। তাই অত্যন্ত সংগত কারণেই, ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয় ঐক্য ও গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে এবং স্বাদেশিকতার চেতনা সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বারোয়ারী পুজোর প্রাঙ্গণকে কৌশলে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন তিনি।
এবার জেনে নেওয়া যাক, শতবর্ষে পা-রাখা সিমলার সেই পুজোর চিত্তাকর্ষক ইতিহাস। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ ও বাঘা যতীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, যুগান্তর দলের বিশিষ্ট নেতা বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসু সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর হাত ধরেই, ১৯২৬ সালে সমিতির মাঠেই শুরু হয় সর্বসাধারণের জন্য বারোয়ারী দুর্গাপুজো। ক্লাবটি ছিল বিপ্লবী আদর্শ প্রচারের ঘাঁটি; দেশমাতৃকার সাধনায় নিবেদিতপ্রাণ একদল তরুণতুর্কিকে জড়ো করে সারাবছর শরীর ও সাহসিকতার চর্চা করতেন অতীন্দ্রনাথ। আর তাদের বার্ষিক পরীক্ষার দিন হিসাবে বেছে নেওয়া হত মহাষ্টমীকে। দেবী দুর্গার সামনে সাহস ও শক্তির পরীক্ষা চলত লাঠিখেলা, ছুরিখেলা, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ এবং তরবারি চালনার মাধ্যমে, বীরাষ্টমী অনুষ্ঠানে।
১৯২৮ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতির তৃতীয়বর্ষের কার্যবিবরণীর পাতা ওল্টালে জানা যায়, সেবছর খুব জাঁকজমক করে বীরাষ্টমী উৎসবের আয়োজন হয়েছিল। ফিবছর বীরাষ্টমী ব্রতের দিন উপস্থিত থাকতেন শরৎচন্দ্র বসু, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, ভূপেন্দ্রনাথ বসু, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কিরণ মুখোপাধ্যায়, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের মত প্রখ্যাত ব্যক্তিরা। সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে এই বারোয়ারী পুজো-কমিটির গভীর হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। কোনো কোনো বছরে এখানকার বীরাষ্টমী উৎসবের উদ্বোধন করতে এসেছেন তিনিও।
সে সময় মহাষ্টমীর দিন এখানে এলাহী অন্নকূট উৎসব হত। সমাজের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও অকাতরে সাহায্য থাকত তার পিছনে। অন্যান্য বিপ্লবীর সঙ্গে অন্নকূট উৎসবে প্রসাদ পেতে আসতেন সুভাষচন্দ্রও। ১৯৩৮ সালের অন্নকূট উৎসবে সুভাষচন্দ্র এসেছিলেন তাঁর মেজদাদা শরৎচন্দ্র ও রাজেন্দ্র দেবের সঙ্গে এবং সকলের সঙ্গে মাটিতে বসে পংক্তি-ভোজনে সামিল হয়ে প্রসাদ গ্রহণ করেন। পুরো বিষয়ের তদারকিতে ছিলেন বিপ্লবী হেমন্তকুমার বসু। সেই বছরটা ছিল সুভাষের জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটা বছর, সে-বারই হরিপুরা অধিবেশনে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৩৮ সালের অন্নকূট উৎসবে পংক্তি-ভোজনে বসে সুভাষচন্দ্রের প্রসাদ গ্রহণের ছবি আজও এই সমিতির কার্যালয়ে সযত্নে রক্ষিত আছে।
সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোর উদ্যোক্তাদের ইচ্ছায় শুরু থেকেই প্রতিমাকে পরানো হত খাদির কাপড়। পুতুল ও অন্যান্য খেলাধুলোর প্রদর্শনীর মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হত দর্শকদের সামনে। বিভিন্ন বাণী লেখা পোস্টার শোভা পেত প্যান্ডেলে। কলকাতার ‘অ্যাডভান্স’ পত্রিকা এখানকার এই দুর্গা-প্রতিমাকে ‘স্বদেশী গডেস’ বলে সম্বোধন করেছিল ১৯৩৪ সালে। এই সমিতি ছিল লাঠিখেলা, কুস্তি, অসিচালনা প্রভৃতি শেখার সর্বপ্রথম সংগঠিত আখড়া। ব্রিটিশ সরকার গোড়ায় ধর্মীয় কাজকর্ম বলে এদের পুজোয় হস্তক্ষেপ করত না। কিন্তু পরেরদিকে বিপ্লবীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ও তাঁদের সরকার-বিরোধী ভাবধারা প্রচারের কৌশল ধরতে পেরে ১৯৩২, ১৯৩৩ এবং ১৯৩৪ সালে তারা এই ক্লাব ও সেইসঙ্গে এদের পুজোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
১৯৩০ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতি সুভাষচন্দ্র বসুকে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই পুজোর সভাপতি নিযুক্ত করে। এটাই প্রথম কোনো সর্বজনীন পুজোকমিটি যার সভাপতি পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন তিনি। টানা ছয়বছর সুভাষ এই পদে ছিলেন। ১৯৩৯ সালে স্বামী বিবেকানন্দের ভাই ও সুলেখক মহেন্দ্রনাথ দত্তের উদ্যোগে সর্বপ্রথম এখানকার পুজোয় ঠাকুরের একচালাকে ভেঙে পাঁচচালায় পরিণত করা হয়। রক্ষণশীলরা এর তীব্র প্রতিবাদ করলেও অতীন্দ্রনাথ এতে কর্ণপাত করেননি। ওই বছরই সিমলা ব্যায়াম সমিতির সংগঠকদের তরফে সুভাষচন্দ্রকে প্রতিমার আবরণ উন্মোচনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। গৌহাটি থেকে ফিরেই তিনি প্রতিমার আবরণ উন্মোচনে আসেন। সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিমার চালাবদল নিয়ে যাবতীয় বিতর্ক তথা সংশয়েরও অবসান হয়।
দেখতে দেখতে উত্তর কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী পুজো আজ শতবর্ষে পদার্পণ করে ফেলেছে। এখনও কিন্তু প্রতিমার সেই চিরাচরিত পাঁচচালার ঐতিহ্য অব্যাহত আছে, থিম পুজো নয়, বরং আদি ও অকৃত্রিম সাবেকি ধারাই কলকাতার এই প্রাচীনতম বারোয়ারী দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব। প্রতিমা গড়েন কুমোরটুলির ‘বেতাজ বাদশা’ শ্রী সনাতন রুদ্র পাল।
