অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
রসময় পুরোহিত মিথ্যে বলেন না। কোনো ভান নেই রসময় ভটচাজের। এই কাকভোরেও তিনি ঠায় একলাটি মোহানার কাছটিতে এসে দাঁড়ান।
সংক্রান্তি মিটেছে কাল। স্নানের ভিড় আজ নেই। রসময় যে জায়গায় দাঁড়িয়ে সে চত্বরে স্নানের সময়েও ভিড় হয় না তেমন। রসময় ভিড় এড়িয়ে দাঁড়ান। আজ তিনি কালীকেও সঙ্গে আনেননি। তিনি জানেন গরুর ল্যাজ ধরে বৈকুণ্ঠ-পারের খদ্দের আজ মিলবে না। বছরের বাকি সময় পুরুতগিরি করেই রসময়ের ভাত জোটে। তবু তিনি মিথ্যে বলেন না। এমনকি মেলার সময় কালীর ল্যাজ ধরতে চাওয়া খদ্দেরদেরও তিনি দিব্যি শুনিয়ে দেন, “এসবই হলো আচার। খুলে বললে লোকাচারের অঙ্গটি কেবল। বুঝলে বাবাসকল। গরুর ল্যাজ ধরেই যদি সটান সগ্গে পৌঁছিয়ে যাওয়া যেত, তবে আর এতকাল আমি এই গরু আর তার ল্যাজ নিয়েই পড়ে আছি কেন বলো দিকি বাবারা? তোমরা তো সব লেখাপড়া-জানা মানুষ!” লোকে শুনে কেউ কেউ হাসে, কেউ অবাক হয়। রসময় তাদের আরও অবাক করে দিয়ে বলেন, “আসলে কী জানো তো বাবা, আচার-অভ্যাসেও মন শুদ্ধ হয়। কারও হয় কম। কারও হয় বেশি। সগ্গে যাচ্ছি এই ভয়, এই ভাবনা থেকেও তো অনেকে মনকে অল্প শুদ্ধ করতে চেষ্টা করে? কী বলো বাবারা? ভুল বললাম নাকি?” তিনি একটু থেমে দম নিয়ে বলেন, “সকলের হয় না। তাও জানি। তবু কারও কারও হয়। কেউ বা একটু তরে, কেউ বা আবার ল্যাজ ছেড়েই ধান্দার কথা ভাবে। আমার পেটে কেবল দুটো অন্ন হয়।” রসময় সেই শীতভোরে একলাটি দাঁড়িয়েছিলেন।
মেলা ভাঙতে শুরু করেছে। স্নানের খদ্দেরও পাওয়া কঠিন আজ। তবু যদি মেলে। ভুল করেও। কয়েকজন। রসময়ের মেলা টাকার প্রয়োজন এখন।
অবশ্য অর্থের প্রয়োজন রসময়ের বহুদিনের। সাগরের কাছাকাছি এক প্রান্তিক গ্রামের পুরোহিত। তার রোজগারই বা আর কতটুকু? গ্রামেরই ছোট্ট মন্দিরে নিত্যপূজার মাসিক বন্দোবস্ত, আর দু’একঘরের মোটামুটি বাঁধা আমন্ত্রণ। এর বাইরে বিয়ে-পৈতে-শ্রাদ্ধ-অন্নপ্রাশন, ছোটখাটো পুজোর ডাক। দাপট বা ভান নেই বলেই বোধহয় দুর্গাপুজো, কালীপুজোয় রসময়ের আমন্ত্রণ জোটে না। কালী-গরু আর রসময় মিলে এই মকরের মেলার সময়েই বরং দুটো পয়সার মুখ দেখেন। ঘরে স্ত্রী আর মেয়ে আছেন। মেয়ের বয়স আঠারো। সরকারি কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। সাগর এলাকারই কলেজ। কলকাতায় পাঠানোর মতো রসময়ের অর্থের সঙ্কুলান নেই। মাসখানেক আগেই স্ত্রীকে নিয়ে রসময় ডাক্তারখানায় গিয়েছিলেন।
রসময় লক্ষ্য করেন বাঁধ পেরিয়ে বড় রাস্তার উপর একখানি প্রাইভেট গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। রসময় চারপাশে তাকান। পুরোহিত-পরিচয়ের আর কাউকে আশেপাশে দেখা যায় না। সংক্রান্তির পরের দিন, এত ভোরে কি আর কেউ শীত সামলে বেরোতে উৎসাহী হয়? রসময় নড়েচড়ে দাঁড়ান। কপাল খুলবে কি?
গাড়ি থেকে যারা নেমে আসে তাদের দেখে ভক্তি হয় না রসময়ের। জ্যালজেলে জিন্স আর টি-শার্ট পরা ফক্কুড়ে চেহারার কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজনকে দেখে একটু আলাদা গোত্রের মনে হয়। পয়সার গরম তারই সবচেয়ে বেশি করে চোখে পড়ে। হাতে মোটা বালার পাশাপাশি তার গলায় একখানি মোটা সোনার চেন শোভা পাচ্ছে। এরপর গাড়ি থেকে নামে নতুন তাঁতের শাড়ি পরা একটি মেয়েমানুষ। কপালে সিঁদুর। হাতে দু’গাছি সোনার চূড়। সদ্য-বিবাহিতা বলে মনে হয়। হিসেবে ভুল হয় না রসময়ের।
দলটা খানিক এগোতেই তাদের হল্লার শব্দ যেভাবে তাঁর কানে ভেসে আসতে শুরু করে তাতে বোঝা যায় গলায় সোনার চেন-পরা লক্কা, গুণ্ডা-মার্কা ছেলেটা আজ এই কাকভোরে মেলায় ছুটে আসতে বাধ্য হয়েছে একান্ত তার নতুন বউয়ের আবদারেই। অন্য সঙ্গীরা সকলেই সাঙ্গোপাঙ্গ তার। গতকালই তাদের আসার কথা ছিল। কিন্তু ভিড় ইত্যাদির অজুহাত দেখিয়ে কোনোমতে ছেলেটি বউয়ের আবদার ঠেকিয়েছে। আসল উদ্দেশ্য ছিল অন্য। আরও একটু কাছে আসতেই সেই উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়। ছেলেগুলোর সবকজনের গা থেকেই চড়া বিলিতি মদের ঘ্রাণ। চাপা দেওয়ার জন্য তারা উগ্র সুগন্ধি মাখলেও রসময়ের নাক মদের গন্ধে ঘিনঘিন করে ওঠে। মেয়েটি অপ্রতিভ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকায়।
“অনেক টাকা লাগবে রসময়বাবু। এই অসুখের অন্য কোনো চিকিৎসা নেই।” ডাক্তারের কথা শুনে একটিবার কেঁপে উঠেছিলেন রসময় পুরোহিত। জীবনের এতগুলো বছর পুরোহিতবৃত্তিতে কাটিয়ে দিলেন। তবু কারোর মাথায় কোনোদিন, এতটুকুও হাত বুলিয়েছেন এমনটা কেউ বলতে পারবে না। এই নিয়ে ভিতরে ভিতরে রসময় খানিক অহংকার করেন। তবু আজ, এই পঞ্চান্ন বছর বয়সে এসে, তাঁকে কিনা সঞ্চয়ের কথা ভাবতে হচ্ছে? সঞ্চয় নেই তাঁর। স্ত্রীর চিকিৎসা তাই রসময়ের কাছে আকাশকুসুম স্বপ্নের মতো মনে হয়। কার কাছে হাত পাতবেন তিনি?
সামনেই সংক্রান্তি-উৎসব। এখন ছোট-বড় সরকারি লোকজনেরা সকলেই সেই মেলা নিয়ে ব্যস্ত। এলাকার বিধায়কের কাছে গিয়ে হাত পাতলেও তো হয়। কিন্তু তাও কোনোভাবেই মেলা মেটার আগে সম্ভব নয়। অথচ মেলা মিটলেই, “প্রথম সিরিজের কেমোটা অন্তত চালু করে দিতে না পারলে,” ডাক্তার ভয় দেখান। সরকারি হাসপাতালে কতটুকু সাশ্রয় হবে? তাও তো অনেক খরচের ধাক্কা। রসময়ের মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। তবু পাড়ার দু’চারজন অভয় দেয়। সরকারিতে একবার নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারলেই হিল্লে হয়ে যাবে গো রসময়। একবার শুধু নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা।
কিন্তু তারপর? ওষুধ? পথ্য? সেবা? রসময় সম্বিৎ ফিরে পান। মেয়েটি তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
“একটু দয়া করবেন ঠাকুরমশাই? মন্ত্রতন্ত্র কিছুই তো জানিনা,” তার গলা বড় চিকন। রসময় কিছু বলতে যাওয়ার আগেই লক্কার সঙ্গীদের মধ্যে একজন গা দুলিয়ে হেসে ওঠে হঠাৎ, “ওফ! মাইরি বউদি তুমি না – এত ভক্তি-ভক্তি করো কেন বলো দেখি! এখন কেবল এক-পতিকে ভক্তি করে যাও বুঝলে! ব্যস তাহলেই,” সে গা দুলিয়ে হেসে উঠতে যায়। লক্কা সেই ছেলেটার নড়া ধরে একটা টান মারে, “এই! চুপ। এখানে শালা কোনো ক্যাওড়ামি নয়! এই নাও নাও, তুমি তাড়াতাড়ি পুজোআচ্চা যা আছে সব সেরে ফেলো তো এখন। দেরী কোরো না। ঝটপট,” শেষ কথাগুলো মৃদুস্বরে, সরাসরি বউয়ের উদ্দেশ্যেই বলা হয়। রসময় সবটা লক্ষ্য করেন। মেয়েটি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়েছিল। সে আবার ঘাড় ফিরিয়ে রসময়ের দিকে তাকায়। রসময় কথা বলেন।
… সেই কথাগুলো রসময় তখন, ঠিক কী করে যে বলে ফেলেছিলেন, ভাবলেই তাঁর মাথা ভোঁ ভোঁ করে ওঠে আবার। একদৃষ্টে মেয়েটির মুখে দিকে তাকিয়ে তিনি স্পষ্ট উচ্চারণে বলে উঠেছিলেন, “আমি যে তোর ভাগ্যমণ্ডলে ঘোরতর অভিশাপের করাল ছাপ দেখতে পাচ্ছি রে মা! এই অন্ধকার থেকে তোর মুক্তি কই!”
ছেলেগুলো হইহই করে উঠেছিল। লক্কা ছাড়া কাউকেই তখন আর এতটুকুও পাত্তা দেননি রসময়। নিজের অভিনয় প্রতিভায় তিনি নিজেই বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন। শেষমেশ লক্কাও যেন মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। মদের গরম আর সোনার চেন দেখেই রসময় বুঝেছিলেন এরা উঠতি পয়সার মক্কেল। এরকম মানুষ বরাবর তিনি এড়িয়ে চলেছেন এত বছর। তবু আজ স্থলন ঘটল তাঁর।
কী যে বুঝিয়েছিলেন রসময়, সেসব তাঁর মনেও পড়ে না। বোধহয় সন্তান-সম্ভাবনায় ঘোরতর কোনো আশঙ্কার বীজ অথবা মহাগুরু-নিপাতের ভয়! মোট কথা সংক্রান্তি কাটিয়ে এই বিলম্বিত স্নানের মাধ্যমে সেই অভিশাপ যে আর কোনোভাবেই কাটবে না, উলটে আরও বেড়ে উঠবে, সেই ভয়ের বিষয়টাই রসময় স্পষ্ট করে লক্কা আর তার বউয়ের মাথায় গুঁজে দিতে পেরেছিলেন। ফলস্বরূপ দোষ কাটানোর মন্ত্রোচ্চারণ, স্বস্ত্যয়ন, শান্তিকামনায় বিশেষ প্রার্থনা, লক্কা নিজেও যে পুরোপুরি বিশ্বাস করছিল এমনটা নয়। কিন্তু মেয়েটি একেবারে পায়ে পড়ে গিয়েছিল রসময়ের। তার চোখের জল রসময়ের পা আর নোংরা বালির উপর একইসঙ্গে টপটপ করে ঝরে পড়েছিল। রসময় খানিক পিছিয়ে গিয়েছিলেন। স্নান শেষে রসময়ের হাতে কড়কড়ে পাঁচশ টাকার বেশ কয়েকটা নোট। ছেলেগুলো চলে গিয়েছিল। মেয়েটি খানিকদূর এগিয়েও, আবারও পিছু ফিরে রসময়ের দিকে তাকিয়েছিল। তার সর্বাঙ্গ ভিজে সপসপ করছে। চোখের জল আর সাগরের জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আকুতি ভরা সেই চোখদুটো তখন রসময়ের বুকে এসে বিঁধেছিল বোধহয়।
রসময় জলের কাছে এসে দাঁড়ান।
“মেলা তো দু’দিন হলো শেষ! এই শীতরাত্তিরে তাহলে আবার কোথায় বেরোচ্ছ বাবা? বলো তো আমায়?” চিকন গলায় লেপের ভিতর থেকে রসময়ের মেয়ে জিজ্ঞেস করে। রসময় ঠোঁটে আঙুল দেন। “চুপচুপ, কাল থেকে তোর মায়ের ওই কেমো না কী যেন শুরু হবে না?” মেয়ের মাথায় হাত রেখে রসময় জিজ্ঞেস করেন। মেয়ে চোখ বোজে। “উমম।” মেয়ে কাঁদে না। রসময় জানেন তাঁর মেয়ে এই ক’দিনেই অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে। খাটের উপর মা আর মেয়ের বিছানা। মেঝেতে মাদুর আর তোশক বিছিয়ে শোন রসময়। এই ব্যবস্থা বহুকালের। রসময় ফিসফিস করে বলেন, “হাসপাতালের টিকিট তো হয়ে গেছে সব। টাকাপয়সা মেটানো আছে। এর পরেরবার থেকে তো খরচ আরও কমে যাবে,” রসময় বিড়বিড় করেন। কী থেকে যে কী ব্যবস্থা হয়েছে তাঁর মাথায় ঢোকে না। কেবল সাগরের পাড়ে দাঁড়ানো সেই মেয়েটির মুখ তাঁর শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে ভিতরে ভিতরে কেটেকুটে তছনছ করে ফেলতে থাকে। বারংবার। তিনি বলেন, “আজ যে বড় ভালো দিন রে মা। যাই একটিবার। ভোরের সূর্যদর্শন সেরে বাবার আশ্রমে একটা পেন্নাম ঠুকে আসি। তাহলেই দেখবি তোর মা’কে নিয়ে আমাদের আর এতটুকুও ভয় থাকবে না!” গলা কেঁপে যায় রসময়ের। মেয়ে আর কোনো আপত্তি করে না। সে গলা অবধি লেপটা তুলে নেয় কেবল। “তাড়াতাড়ি আসবে কিন্তু। দেরী করবে না!” রসময় ঘাড় নাড়েন।
“ঈশ্বর আছেন?” এই প্রশ্নের জবাবে কতবার না রসময় স্পষ্ট কণ্ঠে বলেছেন, “হ্যাঁ আছেন। কিন্তু মন্দিরে নয় গো, মন্দির-মসজিদ-গির্জা, ঠাকুরের সিংহাসন, কোত্থাও তাঁকে পাবে না বাবাসকল। তাঁকে পেতে গেলে ভিতর থেকে শুদ্ধ হতে হয়, আর মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরতে হয়!” তবু সেই শিরদাঁড়া এত সহজে ভেঙে পড়তে চায়? স্ত্রীর মুখ, মেয়ের মুখ, সেই বউটির জলে ভেজা মুখ পরপর রসময়ের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কার কাছে তিনি অপরাধী? সমুদ্র নিরুত্তর। রসময় এক পা এক পা করে জলের দিকে এগোন। সারারাত ঘুম হয়নি তাঁর। কড়কড়ে নোটগুলো তাঁর কাজে লেগেছে। কিন্তু সেই মেয়েটির জলে ধোয়া চোখ, রসময় ভুলতে পারেন না। চারপাশ থেকে টলটলে সমুদ্রজল তাঁকে ঘিরে ফেলতে চায়। কার কাছে তিনি অন্যায় করলেন? তাঁকে শাস্তি দেবারই বা দায় কার? রসময় উত্তর খুঁজতে চান। ঝুপ করে একটা শব্দ হয়।
কুয়াশার ভিতর অর্ধনগ্ন, কাগজকুড়ুনে লোকটা বালিয়াড়ি আর ঝাউবন থেকে মদের বোতল কুড়িয়ে তুলতে থাকে।
- প্রথম পাতা
- বিষয়
- _গল্প
- _কবিতা
- _প্রবন্ধ
- _ভ্রমণ
- _ফটোফিচার
- _বাংলাদেশের কলম
- _ধারাবাহিক
- _ফিল্ম রিভিউ
- _পাঠ পরিক্রমা
- Editions and Archive
- _২৫শে বৈশাখ
- _বৈশাখী সংখ্যা
- _স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা
- _প্রাক শারদ সংখ্যা
- _ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী সংখ্যা
- _শারদ সংখ্যা
- _মাহশা ইরান সংখ্যা
- _দীপাবলি সংখ্যা
- _ঋত্বিক ঘটক সংখ্যা
- _শক্তি চট্টোপাধ্যায় সংখ্যা
- _শীতকালীন সংখ্যা
- _প্রথম বর্ষপূর্তি সংখ্যা
- _বইমেলা সংখ্যা
- _ভাষা দিবস সংখ্যা
- _দোলযাত্রা সংখ্যা
- _পয়লা বৈশাখ সংখ্যা
- _কার্টুন সংখ্যা
- _শারদ সংখ্যা ১৪৩০
- _বিশেষ সংখ্যা
- _রক্ত করবী সংখ্যা
- Contact Us
- Editorial Team
- About Us
