মীন রাশি
পাখনা নাড়ানো ধর্ম যার আমরা মীন রাশি বলি তাকে।
সাঁতার জীবন যার আমরা মীন রাশি বলি তাকে।
অব্যর্থ বড়শি গেঁথে যাওয়ার পর আহত মীনের জীবন তুমি কাকে ডাকছ। যেন জাহন্নম থেকে এখন’ই ফিরে আসবে রক্তাক্ত আয়ুর প্রেত ও পিশাচ। সুতোর গিঁট যখন তোমায় টানছে তখন তুমি বিপরীতমুখী, তুমি সকরুণ ধ্বনি কাকে ডাকছ। এই মেঘ-বৃষ্টি-বাতাসে কে শোনে তোমার ফাঁসকণ্ঠ শতাব্দির এলিজি, মৃত্যুর অভিঘাত। মাঝ দিগন্তে ঢেউ উঠেছে। মাঝ দুপুরে ঢেউ উঠেছে। তুমি কি ভেবেছিলে পাখনা নাড়ানোর কৃত্রিম মাঝামাঝি জীবন। দেখো কুয়োর ভিতর ব্রহ্মাণ্ড কাঁপছে। দেখো সুতো টেনে নিচ্ছে ত্রিভূবন। সুতো আলগা করে দিচ্ছে সব গোপন। সুতোর বাঁধন তুমি কী-ভাবে খুলবে। জল থইথই সুতোর মায়া তুমি কী-ভাবে ভুলবে। সুতো থেকে কী-ভাবে আলগা করবে তার কাঁটা। তুমি তো খেয়েছ তারে, তুমি রাক্ষস, গোপন অন্তপুরে রোপণ করেছ বোবার ক্ষত।
নীপবীথিকার স্নান
আমি তো তোমার প্রত্যাশী ছিলাম মিসেস সেন।
কুয়োর ভিতরে ছিল ভাসমান আমাদের হংসবলাকার জীবন। ছিল টলটল পদ্মপাতার জীবন। ছিল বাতাসে উড়ালপুল আর গান ধরে পারাপার হয়ে যাওয়া অবকাশের ভ্রামণিক বিকেল। তবু আত্মাকে লঙ্ঘন করেছ তুমি। তবু সংশয় আর সঙ্ঘাতকে একত্র করেছ তুমি।
বিগত জন্মের গাহন মনে পড়ে। শেষ দুঃখস্নানে ঋতুজ্ঞানহীন বিহ্বল যেদিন তুমি হারিয়েছ দেহ। ঝিকিয়ে ওঠা বন ময়ূরীর ছন্দে আবডালে, ভেসে গেল অঙ্গবস্ত্র, ভাসালে কিংখাবের ফুল। জলের কাছে বসে অল্প ঝুঁকে নারীর হৃদ্যতায় কেন যে দেখেছিলে জলের মুকুরে শেষ মুখখানি, অলকে আড়াল চরাচর। দেহ থেকে খসে পড়ল বিপন্ন তারকামণ্ডল। খসে পড়ল চন্দ্রহার। যতটা বেহাগ ছিল নূপুরে জড়ানো ছিন্ন করে শৃঙ্খল তার, তুমি গেলে, জলের আরও কাছে গেলে। হৃদিবনে নিবিড় গোধূলি জাগিয়ে ডোবালে সোনার তরী। চকিতে হারালে দৃশ্যাতীতের দিকে। আমি বুদ্বুদের দিকে তাকিয়ে, আমি ইতস্তত কম্পমান জীবনের দিকে তাকিয়ে, আমি শুধু ভাবঘোরে তাকিয়ে রইলাম কত জন্ম জন্মান্তর। ধীরে ধীরে এই চোখ মাছের চোখ, ধীরে ধীরে এই জীবন মাছের জীবন। তুমি দেহহীন ডুবে রইলে আমার বিশ্বাসের জলে। প্রাচীন প্রবাদে তোমাকে’ই লিখেছি জলের ঈশ্বরী।
নববর্ষ
আরও একটি নববর্ষ গড়িয়ে পড়ল কুয়োর জলে, দৈর্ঘ্য জীবন যার প্রস্থ যার দুঃখ আমার ১৪৩২ সাল মিশে যাচ্ছে তার জলে। ১৪৩২ সাল নীল হয়ে যাচ্ছে কুয়োর জলে। আমি দেখি, বড় অসহায়ের মতো দেখি, মানুষের ব্যর্থতা ফাঁক করে দেখি রূপচাঁদা মাছ, পাখনা দোলায়, নাগাড়ে দোলায় আর কেঁপে ওঠে এক একটি মাছের জীবন। কিনারে ধাক্কা খায়, শেওলা তাকে কোনও শীতল বিছানার কথা বলে না, কোনও হরিদ্রাভ অরণ্যের কথা বলে না, কোনও পাকশাল কিম্বা কাচঘরের কথা না বলেই তাকে আবারও ফিরিয়ে দিচ্ছে সাঁতারে।
আমাদের সমূহ শপথ ভেঙ্গে পড়ল কুয়োর জলে। আমাদের সংসার রান্নাবাটী গড়িয়ে গেল কুয়োর জলে। আমাদের নিভৃত চেতনা ঝরে পড়ছে কুয়োর জলে, পড়ছে আর তলিয়ে যাচ্ছে নীল হাঙ্গর-এর গহ্বরে, বলো এখন এই সাঁতারের ভিতর কী করে সাজাই বিবাহের উনুন, প্রসবের থালা, মৃত্যুর উপচার। বলো এই সাঁতারের ভিতর কী করে নববর্ষের শরীর চিরে-খুঁড়ে আমি তুমি আলগা করে নেব তার ঋতুরৌদ্রখেলা।
উপপাদ্য
আর ভালো লাগে না। নীল কুয়োর জলে রূপচাঁদা মাছ। জলে তার পাখনা। নক্ষত্রমণ্ডিত চোখ। একটা দুটো আঁশ ঝরে ঝরে পড়ে। আর এভাবেই একটা জীবন, দুটা জীবন, তিনটা জীবন শুধু সাঁতারের মহিমা ছড়াতে ছড়াতে, শুধু ঢেউয়ের বিহ্বলতা ছড়াতে ছড়াতে, শুধু শেওলার অপরশ ঘ্রাণ ছড়াতে ছড়াতে আমাদের লাল কুয়ো, সবুজ কুয়ো আমাদের শেষ কুয়োটাও নীল হয়ে যায়। শুধু ইতিচিহ্নহীন ক্লান্তির জমাট বরফ থেকে গেল।
তুমি ভালো নেই এক অন্তহীন ফসিল প্রণালীর সৌরচরাচরে। আমিও বিরতিহীন, প্রতিক্রিয়াহীন ভয়াবহ শুভ ও অশুভ মুহূর্তের মাঝে জ্বরার অনুশীলনে একাদেহ মৃত মাস্টারমশাই। জলদবর্ণ পাতায় জেগে ওঠা উপবৃত্তকার ঢাল ধরে খসে পড়ে বারবার প্রাচীন জীবন। হাওয়া ওঠে কেন্দ্র হতে, গর্জে ওঠে মেঘযূথ। শিহরনে কাঠপেন্সিল আর কম্পাসের সাজুয্য হারিয়ে মনে পড়ে কেন যে একদিন তোমায় শেখাতে চেয়েছিলাম কোণ ও কর্ণের গভীরে মাছের পাখনার চলাচল এক নিঝুম উপপাদ্য।
জাদু-দরজা
কুয়োর ভিতর একদিন তুমি কামনা করেছিলে অলৌকিক নূহের বিছানা। কুয়োর ভিতর একদিন তুমি ভুলতে চেয়েছিলে জাহান্নামী মীন রাশির জীবন। কুয়োর ভিতরে একদিন তুমি আবিষ্কার করেছিলে পাতালঘরের প্রকাশ্য দিবালোকের পথ— তোমার পাখনার আঁচড়ে কেঁপে ওঠে। তোমার হৃদি-স্পন্দনে অমিত আয়ুর দরজার জন্ম ও মৃত্যু। অপরিহার্য ভুল পেরিয়ে, জখমের ফেনা ও বুদ্বুদ পেরিয়ে, মিথ ও মিথ্যে পেরিয়ে একদিন তুমি আবিষ্কার করেছিলে জীবনের অসম্ভব সুড়ুঙ্গ। যার খুন ও শ্যাওলা পেরিয়ে মিসেস সেনের ভূত চলে গেছে নিখিল জ্যোৎস্নাবনে, অন্য পৃথিবীতে। তুমি কি তার কাছে যেতে চেয়েছিলে একদিন। একদিন তুমি ভুলে গিয়েছিলে মনে রাখার মতো স্মৃতি। কোজাগর মন তোমার ছিল না। ছিল না অতলে ঋপুভাষ। কীভাবে চিনতে তাকে তুমি।
একদিন অখণ্ড সাঁতার ভেঙে তুমিও দরজার কাছে গেলে। হৃদয়ে হাত রেখে খুলে দিলে কঠিন তালা। তুমি ফিরলে না। স্মৃতিও ফিরেনি আর।
