শুভাঙ্কুর মিত্র
অরুময় এই সময়টাতে সৃজনী হাউসিং কলোনির ছোটো মাঠের চার পাশ দিয়ে হালকা পায়চারি করেন। আজ যেতে ইচ্ছে করলো না। কেমন একটা অস্বস্তি মাঝে মধ্যেই সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। ব্যালকনির ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আনমনে সামনের মাঠে, বাচ্চাগুলোর ফুটবল খেলা দেখতে থাকলেন। আশা ছিলো, সকাল থেকে যে চেষ্টাটা করতে গিয়ে মনের এই অবস্থা করে ফেলেছেন, এই বাচ্চাগুলোর উত্তেজনা আর ছটফটানি, তার থেকে কিছুটা মুক্তি দেবে। এই মুহূর্তে অরুময়ের উত্তেজনা চাই। যে উত্তেজনা, সকাল থেকে হলদে হয়ে যাওয়া মনটাকে একটু ঘষে মেজে আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে পারবে। সকাল থেকে সে চেষ্টা কম করেননি, কিন্তু লাভ হয়নি কিছু। অল্পের জন্য গোল মিস করে হতাশায় ভেঙে পড়া, সহখেলোয়াড়দের ধমকানি, আবার নতুন উদ্যমে সর্পিল গতিতে বাচ্চাগুলোর বল নিয়ে দৌড়োনো, কোনোটাই যখন অরুময়কে সেভাবে উজ্জীবিত করতে পারলো না, অরুময় উঠে পড়লেন। ব্যালকনি থেকে ঘরে ঢুকে আবার স্ক্রিপ্টটা নিয়ে বসলেন। এই কাজটা অবশ্য আজ সকাল থেকে বার দশেক করেছেন। বাজারে যাওয়ার আগে একবার। চিতল পেটি নিয়ে ফিরে আসার পরে একবার, চা এর পরে একবার। ঘুরে ফিরে বারবার স্ক্রিপ্টটা তুলে নেওয়া। অরুময়ের অস্বস্তির কারণ, এই স্ক্রিপ্টটা। বার বার আফসোস করছেন, কি দরকার ছিলো, বুড়ো বয়সে এসবের মধ্যে জড়ানোর? কেন যে ওদের না করতে পারলেন না। ছোটবেলায় নাটক করেছেন ঠিকই। অফিসের রিক্রিয়েশন ক্লাবের নিয়মিত সদস্যও ছিলেন। কিন্তু সেসব প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা। অবসর নেওয়ার বেশ কয়েক বছর আগেই সেসব চুকেবুকে গেছে। ওই বাচ্চা ছেলেগুলোর বাবা-মারা এসে যখন বললো, "জেঠু, এবারের পুজোর নাটকে একটা ছোটো রোল করে দিতে হবে, “আমি কি পারবো, এই বয়সে?” “এসব অভ্যেস কবেই চলে গেছে” অরুময় দুই একবার বলার পরে রাজি হয়ে গেলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন, সময় কিছুটা কাটবে। খুব বড়ো চরিত্রও নয়। এক সহায়-সম্বলহীন বুড়োর চরিত্র। তিনি অভিনয় না করলে, কোথায়ই বা যাবে এরা? হাউসিং কলোনীর পুজো। ছেলেপুলেদের উৎসাহ দেওয়া দরকার। কিন্তু এখন পড়েছেন মহা বিপদে। কারণ, তিনি কাঁদতে পারছেন না। অনেক চেষ্টা করেও কান্নাটা ঠিক আসছে না। অথচ, শেষ দৃশ্যে এক করুন হৃদয়-বিদারক কান্নার দাবি করে ওনার চরিত্র । নাট্যকারের উদ্দেশ্যই ছিলো, শেষ দৃশ্যের ওই কান্নাটা ইমোশনাল ক্যাথার্সিস ঘটিয়ে আবেগাপ্লুত করবে দর্শকদের। নাটক শেষে চোখ মুছতে মুছতে, উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেবে দর্শকমন্ডলী। ফলে এই কান্নাটা মেকি হলে চলবে না। অরুময় আগে যে অন্য নাটকে কান্নাকাটি করেননি, এমন নয়। কিন্তু এখন আর পারছেন না। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেন। কান্নার মুখভঙ্গি ঠিকঠাক করতে পারলেও, গলাটা ঠিক কেঁপে কেঁপে ধরে এলো না। খুব সাধারণ দর্শকও বুঝবে এটা কৃত্রিম কান্না। বিপ্লব বলে যে ছেলেটি নাটকের নির্দেশনার দায়িত্ব নিয়েছে, সে অনেকবার বলেছে, “কাকু, কান্নার জন্য সব চেয়ে কার্যকরী উপায় হলো, পুরনো স্মৃতি ঘেঁটে আপনার নিজের খুব করুণ কোনো ঘটনা খুঁজে বার করুন। আর তারপরে সেটাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। স্ট্যানিস্লাভস্কি ওনার মেথড এক্টিং এ সেটাই বলেছেন”। পুরানো স্মৃতির ঝুলি হাতড়িয়ে, কুড়িয়ে বাড়িয়ে কিছু কষ্টের স্মৃতি তুলে আনা যায় কিনা, অরুময় অনেকবার সে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই বিফল হয়েছেন। ছোটবেলায় স্কুলে কান ধরে, মুরগি হওয়া থেকে শুরু করেছিলেন। তারপরে কলেজে মলিনার প্রেম প্রত্যাখ্যান পর্ব ঘুরে এসেছেন। শেষে অফিসের বড়োসাহেবের তীব্র অপমান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনে করার চেষ্টা করেছেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে এসব ঘটনা মনে করে, খুব যত্ন নিয়ে পুরোনো আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কান্নাটা আসেনি। অথচ অরুময় জানেন, এই সবগুলো ঘটনাতেই একসময় সকলের অগোচরে, চার দেওয়ালের মধ্যে চোখের জল ফেলেছেন। অরুময় বুঝতে পারছেন, সময় অনুভূতির ওপর যে পলির আস্তরণ ফেলেছে, সেটা সরিয়ে ফেলে এই তামাদি দুঃখ গুলোকে, আর ঝকঝকে করে ফেলা যাচ্ছে না। তাহলে কি কোনো দুঃখই চিরন্তন হয় না? হয়তো হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে অরুময়ের কাছে, কোনো ঝাঁ-চকচকে নতুন দুঃখ নেই। অবশ্য দুঃখ জাতীয় কোনো অনুভূতি, এখনকার অরুময়ের থাকার কথাও নয়। বছর দশেক আগে, মোটামুটি বড়ো প্রভিডেন্ড ফান্ড ধরে রেখে রিটায়ার করেছেন। ছেলে দীপ্তজ্যোতি, বিয়ে করে ইংল্যান্ডে সেটলড। নাতনি দিশা, ইংল্যান্ডের লিডস শহরের কোনো একটা স্কুলে, এবার ক্লাস টেন। আর অরুময় আর প্রতিমা, এই হাউসিং কলোনিতে শিং ভেঙে ঢুকে পড়েছেন অল্পবয়সীদের দলে। ছোটোখাটো গেট-টুগেদার, পূজা-পার্বনে সবার সাথে হই হই করে দিব্ব্যি চলে যাচ্ছে তাদের। বলতে নেই, শারীরিক অসুস্থতাও এখনো অবধি খুব বিপদে ফেলেনি অরুময় আর প্রতিমাকে। প্রতিমার রক্তে শর্করা আর অরুময়ের উচ্চ রক্তচাপ, আধুনিক ওষুধের দাক্ষিণ্যে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে। ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুকেও মোটামুটি সাবলীল বিচরণ অরুময়ের। প্রতিমার রান্নার ছবি, নিজের মর্নিং ওয়াকের ছবি আর সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া জোকস, সপ্তাহান্তে ফরওয়ার্ড করে, দশ-বারোটা লাইকের আশায় বসে থাকাতে, অরুময় এক ধরণের রোমাঞ্চ অনুভব করেন । সত্তর উত্তীর্ণ, অরুময়ের মনে করুণ রসের উদ্রেক হওয়াটা, তাই বেশ কঠিন।
রাতের খাওয়া শেষ করে, অরুময় সবে মোবাইলে ইউটিউব চালিয়ে কান্নার এক্টিং ক্লাসগুলো দেখতে শুরু করেছিলেন, পাশের ঘর থেকে প্রতিমার ডাক, “শুনছো? তোমার ছেলের ফোন। তোমাকে চাইছে”। ছেলের সাথে অরুময়ের ফোনে খুব বেশি কথা হয় না। ছেলে আর বৌমার প্রাত্যহিক কথা চালাচালি, প্রতিমার সাথেই বেশি হয়। অরুময় একটু অবাক হলেন। বড়ো কোনো সমস্যা ছাড়া দীপ্তর বাবাকে ফোনে চাওয়ার কথা নয়। তবে কি চাকরি নিয়ে সমস্যা? ব্রেক্সিটের পরে ইংল্যান্ডের ইকোনমি একটু টালমাটাল। চাকরি চলে যাওয়াটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ নিয়ে আগেও ছেলের সাথে কথা হয়েছে। দীপ্ত অরুময়কে বুঝিয়েছে, “তোমরা খবরের কাগজ আর সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে যতটা খারাপ অবস্থা ভাবছো, আসলে ততটা খারাপ অবস্থা নয়। আমার যা এক্সপেরিয়েন্স, তাতে এই চাকরি গেলে, অন্য চাকরি পেতে অসুবিধে হবে না। তুমি চিন্তা করো না”। ছেলের ওপর অগাধ ভরসা অরুময়ের । এখনো পর্যন্ত যা করেছে, নিজের বুদ্ধি এবং আত্মবিশ্বাসে ভর করেই করেছে। অরুময় ঘড়িতে সময়টা একবার দেখে নিলেন। রাত সাড়ে আটটা প্রায়। লিডসে এখন বিকেল চারটা। এ সময় দীপ্তর অফিসে থাকার কথা। অরুময়ের একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। একটু রোমাঞ্চও কি অনুভব করলেন খানিক? করুণ রসের আবির্ভাব কি হতে চলেছে? “কি হলো, ও ধরে আছে”, প্রতিমার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলেন, অরুময়। চটপট হাওয়াই চপ্পলটা পায়ে গলিয়ে, পাশের ঘরে ছুটে গিয়ে ফোনটা ধরলেন।
“হ্যা, বল”
“আর বোলো না। একটা নতুন সমস্যায়…”
“আমি কিন্তু আগেই বলেছিলাম..এই ব্রেক্সিটটা আসলে..”
“ব্রেক্সিট! নির্ঘাত খবরের কাগজ পড়ছিলে!”
“তোর জবটা ..?”
“মানে চাকরিটা? যেমন চলছিল, তেমনই চলছে । হঠাৎ ওটা নিয়ে পড়লে কেন?”
“এই সময়ে ফোন করলি....”, অরুময়ের কথার সুরটা হতাশা মিশ্রিত।
“আজ গুড ফ্রাইডে, বাবা। অফিস ছুটি। যে কারণে তোমাকে ফোন করলাম, সেটা শোনো আগে। আজ সকাল থেকে, আমাদের বাড়িতে একটা নতুন নাটক শুরু হয়েছে। মুখ্য চরিত্রে তোমার নাতনি ।”
“দিশা নাটক করছে?”
“নাটকই। সকাল থেকে কেঁদে ভাসাচ্ছে"
“সেকি? কেনো?"
“এই নাটকের ভিলেন কিন্তু তুমিই”
“আমি? আমি কি করলাম?” অরুময় আকাশ থেকে পড়লেন।
“তুমি নাকি ফেসবুকে, ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন নিয়ে কি একটা পোস্ট করেছো?”
অরুময় ভাবতে বসলেন। ফেসবুকে কতো কিছুই তো ফরওয়ার্ড করেন। ইসরায়েল- প্যালেস্টাইন নিয়ে কোনো পোস্ট বা জোকস ফরওয়ার্ড করেছিলেন বলে তো মনে পড়ছে না। পরক্ষনেই মনে পড়লো, প্রতীকবাবুর পাঠানো আপাত নিরীহ একটা জোকস শেয়ার করেছিলেন। যতদূর মনে পড়ছে, জোকসের মূল বক্ত্যব্য ছিল, প্যালেস্টাইন বোকার মতো ইসরায়েলকে আক্রমণ করে, নিজেরা ছারপোকার মতো মরছে। ওই “পিপীলিকার পাখা গজায়, মরিবার তরে" জাতীয় কিছু।
“হ্যা, একটা জোকস বোধহয়। কিন্তু দিশার কান্নার কারণটা কি?”
“দিশা তোমার ওই পোস্টটা দেখেছে। বলছে, দাদান এমন ইনসেন্সিটিভ কিভাবে হতে পারে? হাজার হাজার বাচ্চা না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে, সেখানে কে আগে আক্রমণ করেছে, সেটা কিভাবে জোকসের বিষয়বস্তু হতে পারে? ”
অরুময় চমকে উঠলেন। নাতনি যে এতটা বড়ো হয়ে গিয়েছে, টেরই পানন । বিশ্ব রাজনীতির কি বোঝে ও? ওইটুকু একটা মেয়ে, এমন একটা বিষয় নিয়ে সারাদিন ধরে কাঁদছে?
“বাবা, দিশার সাথে কথা বলো। আমি সাজেস্ট করবো, শুধু শুনে যাও তুমি। বাস্পটা একটু বেরিয়ে যাক। নিজেই শান্ত হয়ে যাবে। "
অরুময়ের খুব বেশি কিছু বলার ছিলোও না। খুব ভেবেচিন্তে ওই পোস্টটা ফরওয়ার্ড করেননি। সত্যি কথা বলতে, ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন নিয়ে খুব বেশি চিন্তা ভাবনাও করেননি, তেমন করে। এখন এই মেয়েকে, কি ভাবে সান্ত্বনা দেবেন, সেটাই ভাবছিলেন শুধু।
“দাদান, হাউ ক্যান ইউ ডু দিস? হ্যাভ ইউ সিন দোস ফোটোগ্রাফস হোয়ার হানড্রেডস অফ চিলড্রেন আর ওয়েটিং ফর ফুড এন্ড ওয়াটার? হ্যাভ ইউ সিন দ্য পিকচার্স অফ থাউসেন্ডস অফ হিউমান বডিস ডাম্পড অন রোডসাইড? দাদান, তোমাদের হাউসিং কমপ্লেক্সে একজনের আনন্যাচারাল ডেথ হলে, তোমরা কতোটা পারটারবড হও, আমি জানি। কলকাতায় সাতদিনের রাতদখলের ছবি আমি দেখেছি। জাবালিয়া রিফুজি ক্যাম্পে একদিনে পঞ্চাশ জন উওমেন এন্ড চিলড্রেন ডায়েড বিকজ অফ বম্বিং বাই ইস্রায়েল। নান অফ দেম ওয়ার অ্যাটাচড টু হামাস। এরা কেউ পলিটিক্সের সাথে যুক্ত ছিলো না। শুধু আশ্রয় নিতে এসেছিলো ওই ক্যাম্পে। কেনো সেটা নিয়ে কোনো পোস্ট করোনি? কারা প্রোটেস্ট করবে দাদান? ওই বাচ্চাগুলোর যে আর কেউ নেই..”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আবার কাঁদতে থাকে দিশা। অরুময় অসহায় বোধ করতে থাকেন। কোনোরকমে বললেন, “কাঁদিস না মা। আমি তো জানতাম না এতোসব।”
“বাবা, মা বা তোমার এসবে কান্না কেন পায় না, দাদান? কেন শুধু আমিই কাঁদি? তোমাদের কান্নাটা শুধু নিজের আর নিজের পরিবারের জন্যই কেনো জমা থাকে? আমি সেদিন ইন্স্টাতে দেখেছি, একটা এলিফ্যান্টও কাঁদছে, আর একটা এলিফ্যান্টকে মানুষ মেরে ফেলেছে বলে। কেনো আমরা মানুষ হলাম দাদান...."
“আমি কাল কথা বলবো আবার”, অরুময় ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
চোখের কোণাটা মুছে নিতে নিতে ওনার মনে হলো, দিশাকে বলা শেষ কথাগুলো কেমন কেঁপে কেঁপে ধরে এলো। ঠিক যেমনটা তিনি চাইছিলেন। পাশের ঘরে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা খোলা স্ক্রিপ্টটাকে বন্ধ করে, অরুময় কম্পিউটার খুলে গুগলে জাবালিয়া ক্যাম্পের ছবিগুলো সার্চ করতে বসলেন। একটা গভীর ডুব দিতে হবে। সব পাপ মুছে ফেলে, এবার সত্যিকারের মানুষ জন্ম নিতে হবে। খুব তাড়াতাড়ি। জয়, মা গঙ্গা!
