সুমিতা বন্দোপাধ্যায়
নলেন-গুড়ের গন্ধ-মাখা শীত। নরম নীহারে তুহিন হাওয়ার শিরশিরানি। আলতো আঁচড়ে ত্বকে চকের দাগ। হাতে ধরা ধোঁয়া-ওঠা চা। স্মৃতির টানে পিছু-হাঁটে মন। ডুব দেয় স্মৃতি-বিধুর মেয়েবেলার অথৈ সাগরে--
বারান্দার রোদ্দুরে শাল-সোয়েটার, লেপ-কাঁথা আর ঠান্ডায় জমে যাওয়া 'শালিমার'। সাথে বাটি-ভরা খাঁটি 'গণেশ', রোদের সেঁক নেয়। চলে আপাদমস্তক তেল মাখার প্রস্তুতি। ফাটা-ঠোঁট, সরু-চাকলি গাল। তেল ঘষা মাত্র হু হু করে। বালতির জলে রোদ্দুরের ওম। স্নানের পর নাচন লাগে যেন!
অপেক্ষায় ধোঁয়া-ওঠা ভাত আর মাংসের ঝোল। আহাঃ! কি তার স্বাদ! অনাবিল আনন্দ!!
আসে মন-খারাপ করা ঝাপসা দিন। ম্লান আগুন-পাখীর স্নান মেঘ-সায়রে। অতিথি শীতের উঠোনে বৃষ্টির জল-ছড়া। সাথে হাড় কাঁপানো কনকনে উত্তুরে হাওয়া। বৃষ্টি শেষে রোদ ওঠলেই জাঁকিয়ে পড়ে হাড় কাঁপানো শীত। বরফ-ঠান্ডা বিছানা।লেপের ভিতরে পাশ ফেরা দায়। ফুঁ দিলেই তৈরী হয় কুয়াশার বলয়। সামনে বাৎসরিক পরীক্ষা। শিরে সংক্রান্তি। 'কাল' থেকে পড়ব', ভাবে মন। কিন্তু 'কাল' যে আর আসে না! প্রায়শঃই বিদ্যুৎ-বিভ্রাট। অগত্যা হ্যারিকেনের আলোক-বৃত্তে জোরদার পড়াশোনা। পরীক্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষা! শীতের আমেজে দলবেঁধে চড়ুইভাতির পালা। আনন্দ আর ধরে না।
স্বচ্ছ-তোয়া খেজুর-রস। আস্বাদনে মিশ্রি-মেশা ডাবের জল যেন!জিরেন রসের নলেন-গুড়।
আয়েসী-শীতে পিঠে-পুলি-পায়েস!
আহাঃ! এ যেন অমৃতের আস্বাদন!
'কিন্তু সবার চাইতে ভাল পাঁউরুটি আর ঝোলা গুড়'–সুকুমার রায়ের সেই বিখ্যাত পংক্তি। শিশু-মন চেখে পরখ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় লুচি-পরোটার সাথে ঝোলা-নলেনের মেলবন্ধনও কোনো অংশে কম নয়। কড়ে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়া গুড় চেটে খাওয়া! উফ্! সে এক দারুণ মজার ব্যাপার!
রোজ-নামচার 'বাপুজী'র সাথে বড়দিনে মামাবাড়ি থেকে হাজির কেক-কমলালেবু। শুরু টেস্ট-ক্রিকেট । ফ্লাস্কে গলা-ভর্তি চা নিয়ে দাদু রওনা দেয় ইডেনে। বেতারে দাদা শোনে ধারা-বিবরণী। মা কানপাতে বেলা দে'র 'মহিলা-মহল' এ। কাঁথা-মুড়ি দুপুরে চাঁদমামা, শুকতারা, আনন্দমেলা'য় হারিয়ে যায় শিশু-মন।বিক্রম-বেতাল,হাঁদা-ভোদা, বাঁটুল-দি-গ্রেট, নন্টে-ফন্টে নিয়ে দুপুর গড়ায়। মন্দের মোকাবিলায় ম্যানড্রেক মায়াজাল বিছায়। অরণ্যদেব এর বীরত্ব ছড়ায় একরাশ মুগ্ধতা। ইথার-তরঙ্গে বাজে সদ্য সমাপ্ত পূজার নতুন গান। কখনো বা রেকর্ড প্লেয়ারে। মনে চলে কল্প-দৃশ্যের জাল-বোনা। সাথে শারদীয় 'বেতার-জগত' এর পাতা উল্টে গানের কলি গুনগুন। হপ্তা-শেষে আসে হাতুড়ি-মার্কা ফিনাইল এক্সের 'শনিবারের বার-বেলা'। শোনা মাত্র ভয়ে শীতের শিহরণ্। ঠিক সাড়ে-পাঁচটা'য় বসে 'গল্প-দাদুর আসর'। রোববারে 'বোরোলীনের সংসার'। শ্রাবন্তীর সোহাগ সুরের বিজ্ঞাপনী-
'সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রীম বোরোলীন'।শুক্তো-পোস্তর মতো বাঙালিয়ানায় মিলেমিশে একাকার।
'ত্বক যদি কেটে যায়, ফেটে যায়, খসখসে যদি হয়..'
শীতে আপামর বাঙালির একমাত্র ভরসা। চলে
'কেয়ো-কার্পিন নাটকের দিন'। আসে অমর কাহিনী আরব্য রজনী। শীতের নিঝুম রাতি ঢলে পড়ে ঘুমে । শিবরঞ্জণীর স্বাক্ষর-সুর অপেক্ষায় থাকে ভোরের ইথার তরঙ্গের।
হাতে-ধরা গরম চায়ের সাথে ডুবুরি মন ধায় 'এই তো সেদিন' এর ক্ষণে। এই ভাবে খরিফ শীতের গপ্পে মেয়ে-বেলার সেই খাপ-ছাড়া সাত-সকালের স্মৃতি উঁকি মারে।
