দোঁহা

জীবন- মরণের সীমানা ছাড়ায়ে

 


 

সুনির্মল বসু 

প্রতিদিনের মতো আজও সকাল হয়। ভোরের কুয়াশায় বনের পাখিরা ডাকে। গাছে গাছে ফুল ফোটে। গাছের পাতা থেকে রাতের শিশির ঝরে পড়ে। ঘুম থেকে উঠে এসব লক্ষ্য করেন জয়জিৎ সেন। ইদানিং কিছুই ভালো লাগেনা তাঁর। মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবন থেমে গেছে। আর যেন নতুন করে কিছু করার নেই। 

চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন পাঁচ বছর। মেয়ে সৌমিলির বিয়ে দিয়েছিলেন, চাকরি থাকতে-থাকতেই। ছেলে প্রিয়জিৎ
বিদেশে। দক্ষিণ ভারতের একটি মনোবিজ্ঞানী মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করে ইংল্যান্ডে সেটেল হয়েছে। গিন্নী যমুনা দেবী বছর দুই আগে মারা গিয়েছেন।

জয়জিৎ জানালার কাছে ইজি চেয়ারে শুয়ে বাইরের প্রকৃতি দ্যাখেন। বেলা বেড়ে যায়। কাজের মেয়ে ঐশ্বর্যা 
ঘর মোছে, বিছানা তোলে, দুবেলার রান্না করে বিকেলের দিকে চলে যায়।

জয়জিৎ গান শোনেন, বই পড়েন, দৈনিক পত্রিকা পড়ে সময় কাটান। ফ্লাক্সে চা করা থাকে। মাঝে মাঝে চা পান করেন। 

একাকী নিঃসঙ্গ জীবন। সন্ধ্যেবেলার দিকে খুব একা লাগে। মাঝে মাঝে রাত দশটার পর নাতি বুবাই ভিডিও কলে দাদুর সঙ্গে কথা বলে। কিছুটা সময় বৌমা দময়ন্তী শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলে। 

ছেলে প্রিয়জিৎ ছুটির দিনে বাবাকে ফোন করে বলে, "বাবা, কাজের এত প্রেসার, আমি চাপে চন্দ্রগুপ্ত হয়ে গেছি। সময় মত ফোন না করলে, কিছু মাইন্ড করবে না। বউমার কাজ থেকে 
তোমার সব খবরই আমি পাই।"

বিকেল হলে জয়জিৎ পার্কে বেড়াতে যান। এখানেই কিছুদিন আগে আলাপ হয়েছিল, অনন্যা চৌধুরীর সঙ্গে। ভদ্রমহিলা বিধবা। ওনার স্বামী অবিনাশ চৌধুরী কর্মরত অবস্থায় হার্ট এটাকে মারা গিয়েছেন। বৌমা 
উপালী শাশুড়িকে খুব একটা পছন্দ করেনা। অবশ্য আজকাল কোন বৌ বা শ্বশুর শাশুড়ী পছন্দ করে? তাই সংসারে বউ এবং শাশুড়ির মধ্যে মাঝে মাঝে ঠান্ডা লড়াই চলে। 

আজ বিকেলে জয়জিৎ এসে পার্কের বেঞ্চে বসেছেন, অনন্যা এলেন। প্রশ্ন করলেন,"আপনি কি সিআইটি বিল্ডিং এ থাকেন?"
জয়জিৎ ঘাড় নাড়লেন। জয়জিৎ প্রশ্ন করলেন,"আপনিও কি এখানেই থাকেন?"
অনন্যা বললেন,"হ্যাঁ।"

সেই প্রথম আলাপ। 

জয়জিৎ ভেবে দেখেছেন, এই বয়সেও এসে প্রেম-ভালোবাসা হয় কিনা, সেটা তাঁর জানা নেই। কিন্তু এই বয়সে মন একটা বন্ধু কাছে পেতে চায়। জীবনে এমন একজন বন্ধু আসুক, যার কাছে মনের কথা খুলে বলা যাবে। তাঁর কথাও শুনতে ইচ্ছে করবে। জয়জিতের ইদানিং একটা প্রধান সমস্যা হল, তার সঙ্গে কথা বলার মানুষ নেই। অথচ কথা না বললে মানুষ বাঁচে না। মনের কথাগুলো জমে জমে পাহাড় হয়ে গেছে। সেই কথাগুলো বলতে না পারলে, ভেতরে ভেতরে মনটা প্রতিদিন হাঁপিয়ে উঠছিল। 

 আজকাল দুপুর হলেই, জয়জিৎ ঘড়ি দেখা শুরু করেন। তারপর পাঁচটা থেকে সোয়া পাঁচটার মধ্যে পার্কের দিকে হাঁটা শুরু করেন। 

একটু বাদে অনন্যা আসে। পাড় ওয়ালা সাদা শাড়িতে 
কী ভালো যে লাগে, ওকে দেখতে। বোঝা যায়, ভদ্রমহিলা যৌবনে যথেষ্ট সুন্দরী ছিলেন। জয়জিৎ বিবাহিত জীবনে যথেষ্ট সুখী মানুষ ছিলেন। ওর স্ত্রী যমুনা দেবী সব সময় স্বামীর সেবা করে এসেছেন। ও চলে যাবার পর, আজকাল বড় একা লাগে, জয়জিত সেনের। 

হাটতে হাঁটতে ওরা ঝিলের দিকে এগিয়ে যান। অনন্যা বলেন,"আমার কোমরের ব্যথাটা আবার বেড়েছে।"
জয়জিৎ প্রশ্ন করেন,"ডাক্তার দেখান নি?"
"দেখিয়েছি।"
"উনি কি বললেন?"
"একগাদা ওষুধ লিখে দিলেন। 
জয়জিৎ বললেন, "ভয়ের কিছু নেই। বয়স হচ্ছে তো! বয়স হলে, সকলকেই সাবধানতা মেনে চলতে হয়।"
ওরা ততক্ষণে ছিলেন ধারে পাম গাছের ছায়ায় চলে এসেছেন। 
জয়জিৎ প্রশ্ন করলেন,"ছেলে, ছেলের বউ কেমন হয়েছে?"
অনন্যা জবাব দিলেন," ভালোই।"
অনন্যা প্রশ্ন করলেন,"আপনি রান্নাবান্না পারেন?"
"নাতো!"
বাড়িতে কাজের লোক আছে?
"হ্যাঁ।"

সন্ধ্যে হয়ে আসছিল। 

জয়জিৎ বলল,"এবার চলুন বাড়ি যাই। কাল আবার দেখা হবে।"

অনন্যা বলল,"বিয়ের আগে ছেলে আমার ছিল। বিয়ের পর আমার ছেলে আমার নেই। সে খুব বউ ভক্ত। অনেক সময় বাড়িতে থাকতে গিয়ে আমার মন ভালো থাকে না।"
"কিরকম?"
"দুর্গাপূজোর আগে সাত দিনের ছুটি নিয়ে ছেলে ছেলের বউ আর নাতি এসেছিল।সেদিন মল্লিকবাজার থেকে ওর জন্য কমলালেবু এনেছিলাম। ওকে খাওয়াতে গেলাম। বৌমা হারিয়ে রে রে করে ঠেলে উঠলেন। বললেন,"ওসব তুমি খাবে না সোনা। তোমার এসিডিটি হতে পারে!"
"তাই বুঝি?"
"হ্যাঁ। তবে আমি বৌমার মুখের উপর বলে দিয়েছি, তোমার বরকেও তো আমি মানুষ করেছিলাম। আমাকে কি করে বাচ্চা মানুষ করতে হয়, সেটা শেখাতে যেও না"
"তারপর?"
"তারপর থেক বৌমার মুখ বেজার। আমার সঙ্গে কথাবার্তা নেই।"
জয়জিৎ বললেন,"আমার ছেলে বিদেশে থাকে বলে এই প্রবলেমটা আমাকে ফেস করতে হচ্ছে না।"
অনন্যা হাসলেন। বাড়ির গলির মুখে দাঁড়িয়ে বললেন,"কাল তাহলে বিকেলে দেখা হচ্ছে?"

জয়জিৎ বাড়ি ফিরে এলেন। 

অনন্যা পরদিন পার্কে এলেন না। ওর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সন্ধে হয়ে গেল। পরদিনও অনন্যা এলেন না। এবং তারপর দিনও তিনি আসেননি। 

জয়জিৎ সেনের মন খারাপ। কি হয়েছে ওনার, জানতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু কিভাবে জানা সম্ভব? তাঁর বাড়ির কাজের মেয়ে ঐশ্বর্যাকে ও বাড়ি পাঠিয়ে খোঁজ নিলে ভালো হয়। কিন্তু সেটা অত্যন্ত লজ্জার ব্যাপার! কাজের মেয়েটা কি ভাববে? পরে এই ব্যাপারটা নিয়ে ঝি -এসোসিয়েশনে খুব রসালো আলোচনা হবে। অতএব
জয়জিৎ সেন সেই পরিকল্পনা ত্যাগ করলেন। 

অনন্যার জন্য মনে মনে খুব কষ্ট হচ্ছিল জয়জিতের। কদিনের পরিচয়। এতদিন কেউ কারো সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। 

বিকেলে পার্কে আলাপ হয়েছিল। 
তারপর একে অন্যের উপর কেমন যেন একটা নির্ভরশীলতা বেড়েছিল। 

সকাল বেলায় পেপার পড়ে, দুপুরে বিমল মিত্রের উপন্যাস পড়ে সময় কাটছিল জয়জিৎ সেনের। 

কিন্তু অনন্যার খবর না পেয়ে তিনি মনে মনে উদ্বিগ্ন হচ্ছিলেন। ওনার কি শরীর খারাপ হলো? উনি কি অসুস্থ? খবরটা না জানতে পারলে, ভেতরে ভেতরে খুব মানসিক চাপ অনুভব করলেন জয়জিৎ সেন। 

আজ সকালে ঐশ্বর্যা কাজে আসার সময় খবর নিয়ে এলো,"ও বাড়ির বুড়িটা অসুস্থ হয়েছে। ক্যালকাটা হসপিটালের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওনার হাই প্রেসার।"

উদ্বেগ বেড়ে গেল জয়জিতের।

গভীর রাতে খবর এলো, ডাক্তার বাবুদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে, তিনি মধ্যরাতে অন্য পৃথিবীতে চলে গিয়েছেন। যেখানে গেলে, কেউ আর কখনো ফিরে আসে না। 

তাঁর মৃতদেহ বাড়িতে এলো। অনেকে ও বাড়ি গিয়ে শেষবারের মতো তাঁকে দেখে এলেন।

জয়জিতের খুব ইচ্ছে করছিল, ও বাড়িতে গিয়ে অনন্যা কে শেষবারের মতো একবার দেখে আসেন। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন, তাঁকে বাড়িতে ঢুকতে দেখলে, অনেকেই মনে মনে প্রশ্ন করবেন, নিপাট গো- বেচারা সেনবাবু, কেনো ওই বাড়িতে গেলেন? 

জযজিৎ নিজেকে সংযত করলেন। 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। জয়জিৎ পার্কের দিকে যাচ্ছেন। হঠাৎ চারদিকে ধ্বনি উঠলো, 

"বল হরি, হরিবোল!"

পথের পাশে দাঁড়িয়ে পড়লেন জয়জিৎ সেন। 

তাকিয়ে দেখলেন, অনন্যার সারা শরীর সাদা ফুলে ঢেকে গেছে। 

তিনি পথের পাশে দাঁড়িয়ে মৃতদেহের দিকে চেয়ে কপালে মাথা ঠেকালেন।

মনে মনে বিড়বিড় করে বললেন," জীবনের শেষ প্রান্তে আপনাকে বন্ধুর মতো কাছে পেয়েছিলাম। আমার কপাল ভালো না। তাই যে বয়সে মানুষ একটা আশ্রয় খোঁজে, সেই বয়সেই আপনি আমার কাছে এসেছিলেন। 
আমার এমন মন্দ কপাল, আমি আপনাকে ধরে রাখতে পারলাম না। আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকবেন! একদিন অন্য পৃথিবীতে নিশ্চয়ই আমাদের দেখা হবে।"

সামনে নদী। পাশে লাইট হাউস। লাইট হাউসের পাশে একটা বিশাল নিম গাছ। তার নিচে শ্মশান। এই পার্কের কাছ থেকে তাকালে, শ্মশানটা স্পষ্ট দেখা যায়। 

ওখানে চিতা সাজানো হলো। অনন্যার একমাত্র ছেলে, অনির্বাণ মায়ের মুখাগ্নি করলো। 

দাউদাউ করে চিতা জ্বলে উঠলো। নিম গাছের মাথা ছাড়িয়ে সেই ধোঁয়া, আকাশকে ঢেকে ফেললো। 

দূর থেকে দাঁড়িয়ে, জয়জিৎ সেন এই দৃশ্য দেখছিলেন। কিন্তু শরীর খারাপ লাগছিল তাঁর। 

বেশিক্ষণ একভাবে এই দৃশ্য দেখতে পারছিলেন না তিনি। 

তখন মাটিতে সন্ধ্যে নেমেছে। জয়জিত সেন বাড়ির দিকে ফিরে আসছিলেন। 

হঠাৎ মনে হল, পিছনে অনন্যার গলা বেজে উঠলো,
"মন খারাপ করবেন না। ভালো থাকবেন। আপনি তো তবু মানুষের মধ্যে থাকলেন। আমাকে এখন একা একা কত দূর দূর পথে যেতে হবে। প্রতিদিন বিকেল হলে, পার্কে আসবেন। হালকা বাতাস যখন বইবে, তখন বুঝবেন, আমি এসে গেছি। আমি আপনার পাশেই আছি। আমি আপনার কথা শুনতে পাবো। আপনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু আমার কথা আপনি বোধহয় শুনতে পাবেন না। সত্যিকারের বন্ধুত্ব কোনদিন হারায় না। এই বয়সে যৌবনের আবেগ থাকে না বটে, মানুষের মধ্যে একটা আবেগের টান থাকে। মানুষ এই বয়সে একজন আশ্রয় চায়। 
আমরা দুজনেই দুজনের আশ্রয় ছিলাম। এ কথা ভেবে ভালো লাগছে।"

অন্ধকার নেমে এসেছিল। 

বাড়িতে ঢুকতেই, ঐশ্বর্যা বলল,"আজ বাড়ি ফিরতে এত দেরি হল? বাইরে শীতের ঠান্ডা। আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে তো! একটু সাবধান না হলে, এই বয়সে কি চলে?"

জয়জিৎ সেন কোন কথাই শুনতে পেলেন না। 

তাঁর কানে অনন্যার কথাগুলো বাজছিল,
"প্রতিদিন বিকেলে পার্কে আসবেন। হালকা বাতাসের মতো আমি তখন আপনার কাছে আসবো। আমাকে ভুলে যাবেন না তো?"

জয়জিৎ‌ মনে মনে বললেন, আমি তোমাকে ভুলিনি অনন্যা। যারা ভুলে যান, আমি সে দলের মানুষ নই। যতক্ষণ শ্বাস আছে, তুমি আমার ভিতরে ও বাইরে আছো। পৃথিবীর কোন শক্তি তোমাকে আমার কাছ থেকে কোনদিন আলাদা করতে পারবে না।"

ঐশ্বর্যা বলল,"টেবিলে চা দিয়েছি। খেয়ে নিন।"






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

মোট পৃষ্ঠাদর্শন