তৈমুর খান
আমরা যদি জুল ভের্ন (Jules Verne)-এর 'Twenty Thousand Leagues Under the Seas'-এর কথা ভাবি, তবে সেখানে দেখতে পাই ক্যাপ্টেন নিমো (Nemo) ডাঙার জগৎকে ঘৃণা করে সমুদ্রের নিচে ডুব দিয়েছেন। তাঁর সেই ডুব দেওয়াটা ছিল— স্বাধীনতার ঘোষণা। তিনি বলেছিলেন, "The sea is everything... It is an immense desert, where man is never lonely, for he feels life stirring on all sides." আমাদের বেঁচে থাকার জীবনও তেমনি, সর্বদা আমরা ডুব দিয়ে চলেছি এই সংসার সমুদ্রে। যে জীবন আমরা পেয়েছি তাতে আমরা সন্তুষ্ট নই— তাই অবিরাম আমাদের ডুবের লীলা চলতেই আছে। সমস্ত জীবন ধরেই এর কখনো সমাপ্তি ঘটবে না।
আর এই ডুব দেওয়াকেও লালন ফকির সাধকের পর্যায়ে বিচার করেছেন।লালন ও সুফি দর্শনে 'দিল-দরিয়া' বা The Ocean of Heart-এ মানবদেহটাকেই একটা মহাসমুদ্র হিসেবে দেখা হয়েছে। তাই বাউলে বলা হয়েছে :
"যে ডুব দিতে জানে না,
সে কি রত্ন পাবে?
তার নাকে মুখে জল ঢুকিবে
সে তো অকালে মরিবে..."
এখানে লালন খুব প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক কথা বলেছেন। সাঁতার না জানলে যেমন জলে নামলে বিপদ, তেমনি আধ্যাত্মিক সাধনার কৌশল (দম বা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ) না জেনে মনের গভীরে ডুব দিলে মানুষ পাগল হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, ‘ডুব’ এখানে একটি কৌশল বা টেকনিক।
সাহিত্য ও দর্শনে 'ডুব' বা নিমজ্জন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক। এটি কেবল জলের গভীরে যাওয়া নয়, বরং নিজের সত্তার গভীরে প্রবেশ, সত্য অনুসন্ধান, অথবা অসীম শূন্যতায় বিলীন হওয়ার প্রতীক।দেশি ও বিদেশি সাহিত্যে 'ডুব' প্রসঙ্গটি নানাভাবে এসেছে, তার একটি বিশ্লেষণমূলক আলোচনা নিচে তুলে ধরলাম।
ভক্তি, প্রেম ও আত্ম-অনুসন্ধান
বাংলা সাহিত্যে 'ডুব' শব্দটি মূলত তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে: আধ্যাত্মিক মুক্তি, গভীর প্রেম এবং জীবনের রূঢ় বাস্তবতা থেকে পলায়ন।
১)শ্যামাসঙ্গীত ও বাউল দর্শন
বাঙালি মানসে 'ডুব' শব্দটির সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যবহার সম্ভবত ভক্তিগীতিতে। এখানে ডুব দেওয়া মানে সংসারের মায়া ত্যাগ করে ঈশ্বরের ভাবসাগরে তলিয়ে যাওয়া। সাধক বলেন :
"ডুব দে রে মন কালী সাগরে,
ওরে আমার মন, তুই ডুব দিলে রতন পাবি..."
— (কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি বা মতান্তরে রামপ্রসাদ)
এখানে সাগর হলো জ্ঞান বা চেতনার প্রতীক। উপরিভাগে থাকলে কেবল ঢেউ অর্থাৎ সংসারেই যন্ত্রণা পাওয়া যায়, কিন্তু গভীরে ডুব দিলে রত্ন অর্থাৎ মুক্তি বা জ্ঞান মেলে।
২) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: রূপ ও অরূপের সন্ধান
রবীন্দ্রনাথের কাছে ডুব দেওয়া মানে সীমার মধ্যে অসীমকে খোঁজা। এটি মৃত্যুর মহড়া নয়, বরং নবজন্মের প্রস্তুতি। তাই কবি দার্শনিক চেতনার আলোকে ডুবকে দেখেন :
"রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতন আশা করি
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী..."
— (গীতবিতান)
কবি এখানে পার্থিব সৌন্দর্যের (রূপসাগর) গভীরে গিয়ে অপার্থিব সত্যকে (অরূপ রতন) খুঁজছেন। বাইরের জগৎ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্তর্জগতে মগ্ন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখানে প্রবল।
৩) জীবনানন্দ দাশ: বিপন্ন বিস্ময় ও অন্ধকার
জীবনানন্দের কবিতায় 'ডুব' শব্দটি প্রায়শই এক বিপন্ন অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। জলের নিচে চলে যাওয়া মানে ইতিহাস, সময় বা মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ পাওয়া। নিজেকে বিলীন করে দেওয়া:
"অন্ধকার ছাড়া আর কোনো নেই শান্তিকল্যাণ,
মানুষের লক্ষ লক্ষ বছর এখন
অন্ধকারের ভিতরে ডুব দিয়ে আছে..."
— (কবিতা: অন্ধকার)
বিশ্বসাহিত্য: মনস্তত্ত্ব ও সাহসিকতা
বিদেশি সাহিত্যে (বিশেষ করে ইংরেজি ও ফরাসি) 'Diving' বা 'Sinking' বিষয়টি প্রায়শই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Psychoanalysis) বা অজানাকে জানার অদম্য কৌতূহল হিসেবে এসেছে।
১) অ্যাড্রিয়েন রিচ (Adrienne Rich): সত্যের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আমেরিকান কবি অ্যাড্রিয়েন রিচের বিখ্যাত কবিতা "Diving into the Wreck" নারীবাদী সাহিত্য ও মনস্তত্ত্বের এক অপূর্ব নিদর্শন। এখানে 'ডুব' মানে পুরনো মিথ বা মিথ্যা ইতিহাস ভেদ করে নিজের আসল পরিচয় বা সত্যকে খুঁজে বের করা। কবি লিখেছেন:
"I go down.
Rung after rung and still
the oxygen immerses me
the blue light
the clear atoms
of our human air.
I go down..."
কবি জলের নিচে নামছেন, কোনো গুপ্তধন খুঁজতে নয়, বরং ধ্বংসাবশেষ (Wreck) বা আসল সত্যটা দেখতে—যা ইতিহাসের বইতে লেখা নেই।
২) রুমি (Rumi): প্রেম সাগরে বিলীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই সুফি সাধক রুমির কাছে ডুব দেওয়া হলো আমিত্ব বা 'Ego' বিসর্জন দেওয়া। তাই তিনি বলেছেন :
"You are not a drop in the ocean. You are the entire ocean in a drop."
বা,
"Stop acting so small. You are the universe in ecstatic motion."
অর্থাৎ রুমি বারবার বলেছেন, ঈশ্বর বা প্রেমের সাগরে ডুব দিলে মানুষ হারিয়ে যায় না, বরং সে নিজেই সাগরে পরিণত হয়।
৩) ফ্রিডরিখ শিলার (Friedrich Schiller): সাহসিকতার পরীক্ষায় জার্মান কবি শিলার তাঁর "The Diver" (Der Taucher) ব্যালাডে ডুবুরিদের সাহসিকতা এবং প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপ বর্ণনা করেছেন। সেখানে রাজা একটি সোনার কাপ সমুদ্রে ফেলে দেন এবং বলেন, যে তা তুলে আনতে পারবে, কাপটি তার।
এখানে ডুব দেওয়া হলো মানুষের লোভ এবং প্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায়ত্বের এক ট্র্যাজিক পরীক্ষা। শেষবার ডুব দিয়ে নায়ক আর ফিরে আসে না, কারণ— "The wave brought him not back again."
গদ্য ও কথাসাহিত্যে 'ডুব' প্রসঙ্গ
গল্প বা উপন্যাসে 'ডুব' বিষয়টি প্রায়শই চরিত্রের মানসিক অবস্থার রূপক হিসেবে আসে।
হেমিংওয়ে ও আইসবার্গ থিওরি থেকে পাই, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখার স্টাইলকে বলা হয় 'আইসবার্গ থিওরি'। গল্পের সাত ভাগ জলের নিচে (গভীরে/উহ্য) থাকে, আর এক ভাগ উপরে ভাসে। পাঠককে ডুব দিয়ে সেই অর্থ বুঝে নিতে হয়। The Old Man and the Sea-তে সান্তিয়াগোর সমুদ্রযাত্রা এক অর্থে নিজের বার্ধক্য ও একাকিত্বের অতলে ডুব দেওয়া।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি'তে কুবের মাঝির জীবন আক্ষরিক অর্থেই জলে ভাসা। কিন্তু রূপক অর্থে, তারা দারিদ্র্য আর প্রবঞ্চনার এমন এক গভীরে নিমজ্জিত যেখান থেকে ডাঙায় ওঠা প্রায় অসম্ভব। 'ময়না দ্বীপ'-এর স্বপ্ন দেখা যেন সেই ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা।
ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে বুঝতে পারি 'ডুব' আসলে একটি 'সিলেক্টিভ আইসোলেশন' বা নির্বাচিত বিচ্ছিন্নতা। যখন কেউ ডুব দেয়, সে বাইরের কোলাহল, আলো এবং বাতাস থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়। সাহিত্যিকরা এই বিচ্ছিন্নতাকে ব্যবহার করেন চরিত্রকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য। জলের নিচে শব্দ শোনা যায় না—সেখানে থাকে কেবল নিজের হৃৎস্পন্দন।
