দোঁহা

বিরহে পিরীতি বাড়ে

 


 মালবিকা মিত্র

-"জেঠিমা প্লিজ, ওকে আমি আর একদিন কেন, এক মিনিটও টলারেট করতে পারব না। জাস্ট আনটলারেবল। ও গোল্লায় যাক, গেট লস্ট। ওর সাথে থাকার কোন প্রশ্নই নেই।" সুভদ্রা ধৈর্য রাখতে পারছে না। আমি শুধু বলেছিলাম সিদ্ধান্ত নেওয়া তো নিজের হাতে, যে কোনো সময় নিলেই হয়। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত নিস না, যেটা পরে মনে হবে "আরেকটু কি আমার ধৈর্য দেখানো উচিত ছিল"। এই অনুশোচনা যেন না হয়। অনুশোচনার শাস্তিটা বড় বেশি যন্ত্রণা দেয় রে মা। কারণ অন্য কাউকে দোষ দিয়ে সান্ত্বনা পাওয়া যায়। নিজেকে দোষ দিয়ে আজীবন ভুগতে হয়। কিন্তু সুভদ্রা অতনুর ক্ষেত্রে আর এক মিনিটও ধৈর্য দেখাতে রাজি না। 

অবশেষে আমি বললাম বেশতো আমার উপস্থিতিতেই সিদ্ধান্ত হোক, আগামী দু মাসের মধ্যে তোমরা নিজেদের মধ্যে কেউ কোন যোগাযোগ রাখবে না। এমন কি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়েই দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে সেপারেটলি চলে যাবে। পথে সিন ক্রিয়েট করবে না। এখানে আমার মান সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। আগামী দুমাস কোন ফোন নয়। মেসেজ নয়। দুজনের কথা ভাববেও না। শুধুমাত্র দুজনে দুটো খাতা ডায়রি হিসেবে ব্যবহার করতে পারো। আমি দুটো ডায়রিই দেখব। সুভদ্রা বলল, "প্লিজ দুমাস নয়, দু'বছর নয়। ওকে সারা জীবনের জন্য দূর করে দিতে চাই মন থেকে। এ বিষয়ে তোমরা কোন চাপ দিও না আমাকে"।

তার পরের কথা জলের তলায় তলিয়ে গেছে, তুলে আনতে দেরি হবে। আব্দুল মাঝির সেই কথাটা বলেই এবার থামবো। দুমাসের অনেক বেশি সময় কেটে গেছে। সুভদ্রা আর অতনুর কোন খবর আর পাইনি। থাক সে কথা আসল কথা যেটা বলবো, নিত্য সাত সকালে উঠে পড়ে কিছু প্রাতঃক্রিয়া সম্পূর্ণ করা। বার দুই চা খাওয়া। রাবার স্টাম্প, লেটার হেড নিয়ে আধঘন্টা বসা, জনসেবায় যুক্ত হওয়া। তারপর ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে ৯:৩৭ এর বর্ধমান লোকাল ধরে কর্মস্থলে পৌঁছানো। বিকেল সাড়ে পাঁচটা কি ছটায় ঘরে ফেরা। পরের দিনের জন্য দোকান হাট-বাজারের কাজ সেরে রাখা। দুজন মিলে একসাথে এ দোকান সে দোকান, এ লোক সে লোক, কিছু কথাবার্তা। অতঃপর চক্রবৎ আবার সেই ঘরে সেঁধিয়ে পড়া। দুজনে মুখোমুখি চায়ের কাপে, দুজনের কর্মক্ষেত্রের নিত্য নতুন গল্প ও পরস্পর অভিজ্ঞতা বিনিময়। এই ছঁকে বাধা জীবন। 

এর নাম জীবন! মাঝে মাঝে হরিপদ কেরানির সাথে এই মোটা বেতনভোগী মনসবদারের জীবন কোন ভেদ খুঁজে পায় না। সবকিছু পন্ড মনে হয়। সহকর্মীরা বলে, দু চার দিন দুজন মিলে বেরিয়ে পড়ুন। কোথাও ঘুরে আসুন। এমনকি বন্ধুরা রেলের টিকিট রিজার্ভেশন করে, হোটেল ঠিক করেও দিয়েছিল সেবার। কিন্তু যাত্রার দুদিন আগে বাবা একটু অসুস্থ বোধ করলো। ফলে ঝুঁকি নিলাম না, সমস্ত বুকিং - রিজার্ভেশন ক্যান্সেল করলাম। যদিও বাবার তারপর আর কোনো সমস্যা হয়নি। ক্যান্সেল করার পরেই তার শরীর সুস্থতা বোধ করেছিল। বেশ মনে আছে আরেকবার বেড়ানোর সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ হবার পরেও শুনতে পেলাম, আমার দিদির বেড়াতে যাওয়ার প্রোগ্রাম ওই একই সময়ে। অতএব দিদির কাছ থেকে বাবাকে আমার কাছে নিয়ে আসলাম। সে বারও বেড়ানোর প্রোগ্রাম বাতিল হলো নিজেরটা। এখন অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি মুজতবা আলীর সেই কথা, উঠোন সমুদ্র পেরোনো সবচেয়ে কঠিন কাজ। 
যা গিয়ে ওই উঠানে তোর, দাঁড়া
লাউমাচাটার পাশে, 
ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল
সন্ধ্যার বাতাসে |
কে এইখানে এসেছিল অনেক আগে,
কে এইখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে |
কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে,
এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালবাসে |
ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না,
নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না !
ফুরোয় না, মুড়োয় না বলেই উঠোন সমুদ্র পার হওয়া এতো কঠিন। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। 

তবে একবার পার হলেই শুরু হয়ে যায়, এ্যাকশন...সাউন্ড...ক্যমেরা মুভ...সন্ধ্যে পর্যন্ত চলেছে ঘরে এই ক'দিনের পর্যাপ্ত রসদ সঞ্চয় করে রাখা। যাতে যে ভদ্রলোক থাকবেন তিনি তার স্ত্রী বউ ছেলে বৌমাকে নিয়ে আনন্দ করে কদিন এখানে কাটাতে পারে। তার আয়োজন, টাকা পয়সা গুছিয়ে রেখে যাওয়া, যাতে ওদের আনন্দে ঘাটতি না হয়। ওদের নিরানন্দ আমাকে বেড়ানোর স্বস্তি দেবে না। সন্ধ্যার খাওয়া-দাওয়া সেরে ফেলেছি। অভিমুন্য এসে চাবি, টাকা-পয়সা, কোথায় কি রাখা আছে, সব বুঝে নিলো। এ ঘরের বিছানা, ও ঘরের বিছানা, সবকিছু। এর মধ্যেই বাড়ির গেটে রিক্সার আওয়াজ আমাদের মালপত্র অভিমন্যুই রিকশায় তুলে দিল। আমরা রিকশায় উঠে পড়লাম। 

এই রিকশাটায় প্রতিদিন চেপে যাই, সকালের ট্রেন ধরতে। অথচ সেই রিকশাটাকেই আজ ভারী সুন্দর, অন্যরকম লাগছিল। রিক্সায় উঠেই মনে হল আকাশটা যেন কি সুন্দর ঝলমলে। প্রকৃতি পরিবেশ যেন সুন্দর হয়ে উঠেছে আকাশের সাথেই সঙ্গতি রেখে। দিনটা ছিল লক্ষ্মীপুজোর দুদিন আগের। চাঁদের উজ্জ্বলতাও তীব্র। রেল স্টেশনটাকেও কোন দিন এত ভালো লাগেনি, আজ যেমন লাগছে। স্টেশনে উঠেই দুজন দু'বার চা নিলাম। শর্মাজির চায়ের স্বাদও আজ ভিন্নতর। একটু আগেই বের হতে হয়েছে, কারণ পদাতিক এক্সপ্রেস ছাড়বে শিয়ালদা স্টেশন থেকে। অতএব হাওড়া থেকে ট্যাক্সি ধরে শিয়ালদা পৌঁছানো, একটু তো সময় লাগবেই। রিকশা থেকে শুরু করে, সমগ্র ট্রেন পথ, রাজপথ, এমনকি সিগনালে আটকে থাকাগুলো যে এত মনোরম আনন্দদায়ক, তা কোনদিন বুঝতে পারিনি। আমার ভ্রমণ কিন্তু উঠোন সমুদ্র পেরোনর পরেই শুরু হয়ে গেছে। 

আসলে রোজ দিনের এই পথটা আমি বাধ্য হয়ে, বাঁধা ধরা জীবনের অংশ হিসেবে যাই। আজ আমি বাধ্য নই সম্পূর্ণ ইচ্ছায় চলেছি। কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে রাজভোগ খাওয়ালেও "সে তো খাওন নয়। তারে কয় গেলোন।" এখানেই পার্থক্য। ট্রেনের এসি থ্রি টায়ারে প্রবেশ করা মাত্র মনে পড়ে গেল, আমার দিদির ছেলের সেই পাগলামির কথা। সরকারি দোকান মঞ্জুষার এসি শোরুমে ঢুকে দিদির ছেলে যেটাতেই হাত দেয়, দেখে কনকনে ঠান্ডা। ওটা ছিল ওর প্রথম এসি রুমে প্রবেশ। সে চিৎকার করে বলেছিল "ও মা! কি ঠান্ডা! যেটা ধরছি সেটাই ঠান্ডা! হাউ হাউ, ঠান্ডা খাই, ঠান্ডা খাই। আইসক্রিম আইসক্রিম।" কি  মুশকিল দেখুন, বেড়াতে বেরিয়ে ঘরের কথা পেছন ছাড়ছে না। 

ট্রেন পথে আমি কখনোই ভারি খাবার খাওয়ার পক্ষে নয়। রাতের খাবার হিসেবে হাতে গড়া রুটি, আলু পেঁয়াজ ভাজা, আর মিষ্টি, এটাই নিয়েছিলাম। খেতে গিয়ে মনে পড়লো মৌরিগ্রাম স্টেশনে একবার প্লাটফর্মে কয়েকটা বাচ্চা রুটি এবং তরকারি বা আলুভাজা  জাতীয় কিছু খাচ্ছে এক জায়গায় জড়ো হয়ে। আমার দিদির ছেলে আমাদের হাত ছাড়িয়ে সেই দিকে ধেয়ে যেতে চাইছে। আর উচ্চস্বরে বলছে "উটি আউ ভাজা খাবো।" বাড়িতে নিত্যদিনের খাদ্যে ওটা যে তার খুব পছন্দের মেনু তা নয়। কিন্তু অন্য কাউকে খেতে দেখলে সেটাই তার প্রথম পছন্দ। এই সেরেছে, দেখুন, আবারও ঘর আমাকে পেছনে টানছে। 

সকাল সকাল নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে বসাক মোটর ভেহিক্যালের গাড়িতে আমরা এগিয়ে চললাম। গন্তব্য প্রথমে তিনচুলে দুদিন, তারপর লামাহাট্টা দুদিন, শেষে দার্জিলিং একদিন থেকে, দ্বিতীয় দিন ফিরে আসা। তখনও তিনচুলে লামাহাট্টা
ট্যুরিস্ট স্পট হয়নি। এতো মোবাইল ফোন ইন্টারনেট সংযোগ ছিল না। একটি দোকান থেকে এসটিডি করা হতো। প্রতি দিন সকাল সকাল বাড়িতে অভিমন্যু কে, দিদির বাড়িতে ফোন করতাম। ওই সময় এসটিডি চার্জ থাকতো কম। নিজেই অবাক হতাম ৭০০০ ফুট ওপরে উঠেও, আমি মাটিকে, আমার বাড়িকে, ভুলতে পারছি না। অথচ প্রাত্যহিক ধূলামলিন জীবন থেকে একটু রেহাই পেতে এত উপরে আসা। মনে পড়ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের সেই কবিতার লাইন --
ছাড়া পেতে ছোটো যেখানেই, 
খুঁটির বাঁধন কি করে খুলবে? 

সকালে পৌঁছে, একটূ টিফিন সেরে, কাছেই একটা মনাসট্রিতে ঘুরে এলাম। সুন্দর। দেখনদারি নেই কিন্তু পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে উঠে, অনেকগুলো ধাপ। বেশ পুরনো মনে হলো। ঘুরে বেড়াতে ভালই লাগছিল। এসে ট্রেন জার্নিতে ক্লান্তই ছিলাম। দুপুরে খেয়েদেয়ে একটু গড়িয়ে নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। বেড়াতে এসে ঘুমানোর আমি পক্ষপাতী নয়। কারণ মনে হয় যেটুকু ঘুমালাম সেটুকুই নতুন কিছু দেখা থেকে বঞ্চিত হলাম। যাই হোক বসে ছিলাম বারান্দায় দিগন্ত বিস্তৃত শুধু ঢাল এবং উপত্যকা কুয়াশা ঘেরা। আর দূরে আবছা কোন পাহাড়ের সারি। দুটি কাপ আর একটা ফ্লাস্কে ভর্তি চা দিয়ে গেছে। যতক্ষণ ইচ্ছা ঢালছি আর খাচ্ছি। হোম স্টের প্রৌঢ়া মহিলা বলে গেলেন, পাহাড়টাকে দেখতে থাকুন, কিভাবে দূরে ঝাপসা পাহাড় পাল্টে যাবে। এমন দৃশ্য কল্পনা করতে পারবেন না। 

আলো ক্রমশ কমে আসছে। আর দূরে যেটা কুয়াশা ঝাপসা বিস্তীর্ণ উপত্যকা দেখতে পাচ্ছিলাম, সেখানে একটা বিরাট আকৃতির মৃদু লালচে থালার মত চাঁদের উদয় হচ্ছে। খুব লো ভোল্টেজ। খুবই ধীরে ধীরে দূরের পাহাড় গুলো যা ছিল এতক্ষন প্রায় সারাদিন কুয়াশার আড়ালে, সেখানে জোনাকির মত কিছু ঝিকমিক করে জেগে উঠছে, একটা শহর। ওটা নাকি সিকিমের পাহাড়, নামচি। আর ওই থোকা থোকা জোনাকির ভিড়টা নাকি নামচি বাজার। ধীরে ধীরে বিরাট থালার আকৃতি লালচে লো ভোল্টেজের চাঁদের আবির্ভাব, ক্রমশঃ সেটা স্পষ্ট ও উজ্জ্বল হতে থাকলো। জানলাম আগামীকাল পূর্ণিমা। ওই চাঁদ আরো বড় হবে পূর্ণতা লাভ করবে এত গাড়ো অন্ধকার আকাশ, আর এত সুন্দর চাঁদ এবং দূরবর্তী পাহাড়ি শহর, আমার দেখা ছিল না। সত্যিই এক মুগ্ধতা এনে দিয়েছিল। 

তারপরেই মনে পড়ল পরদিন পূর্ণিমা মানে লক্ষ্মীপূজো। পাড়ায় বাড়িতে বাড়িতে বিরাট উৎসবের আমেজ। পুরোহিতদের ব্যস্ততা। সেই সাথে মনে পড়লো গাঙ্গুলি জেঠিমার বাড়িতে স্পেশাল খিচুড়ি ভোগ। ইস বেরোনোর আগে জেঠিমাকে বলে আসা হয়নি। নিশ্চয় ই জেঠিমা ছেলের বউকে দিয়ে আমার বাড়ির উদ্দেশ্যে খিচুড়ি ভোগ পাঠাবে। কত বয়স হয়ে গেল জেঠিমার, আশির ঊর্ধ্বে তো বটেই। এখন আর আগের মত এ বাড়ি ও বাড়ি অভিভাবকের ভূমিকায় খোঁজখবর নিতে পারেন না আমরাই বরং যাতায়াতের পথে ওদিক দিয়ে গেলে, মাঝেমধ্যে দেখা করি। খবর নিই। আচ্ছা উনি সুস্থ আছেন তো? লক্ষ্মীপূজো এ বছর হবে তো? অনেক দিন দেখিনি। 

দেখুন আবার কেমন পাহাড়ে এসেও সমতলের চিন্তা আমাকে ঘিরে ধরছে। বুঝিনা কি করে এড়াবো একে। অথচ আমি তো এড়াতে চাই। তার জন্য এত উঁচুতে আসা। ওখানে কালিম্পং গভর্মেন্ট স্কুলে, বেশ কয়েক বছর হলো, আমার কলিগের ছেলে অভিনব চাকুরীরত। দেখা করলাম ওর সাথে। ওকে বললাম এখানে তো বিস্তর ঘোরার জায়গা। দারুন আনন্দে আছিস তাই না? ডেলো, সিলারিগাঁও, তাকদা, চটকপুর, সবই তো তোর নাগালে। ও ঘুরে দেখালো ওর স্কুলটা। পাহাড়ের তিন ধাপে অবস্থান করছে। ভারী মজার লাগছে। একটা ধাপে অনেকটা সমতল ভূমি। সেখানে কিছুটা স্কুল বাড়ি আর খোলা পরিসর। ছাত্র-ছাত্রীদের ছুটোছুটি হুটোপুটি করার জায়গা। পাহাড়ের ঢাল দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আর একটা ধাপ। সেটা একটু কম প্রশস্ত। সেখানে স্কুল বাড়ী অপেক্ষায় কম। খোলামেলা অঞ্চলটাই বেশি। আর তার ওপরে যে ধাপ সেখানে কোন ঘরবাড়ি নির্মাণকাজ নেই। খোলা অঙ্গন, কিছু গাছপালা। কদিন রোদ ছিল না, মেঘলা ভাবছিল। তাই রোদ দেখা দিতেই সমস্ত ছাত্রছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকা সকলেই তিন তলার মুক্ত অঙ্গনে রোদে নিজেদের সেঁকে নেওয়ার জন্য ব্যস্ত। 

পুজোর ছুটি এখানে পুজোর কটাদিনই থাকে। একটানা পূজোর ছুটি না। কারণ শীতের সময় ঠান্ডা অনেক বেশি। তখন একটানা লম্বা ছুটি থাকে। আমি অভিনব কে বললাম, খুব আনন্দ, খুব ঘুরে বেড়াস, তাই না? এখানে যে কোন জায়গায় থেকে, বোধহয় স্কুলের যে কোনো ঘর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট দেখা যায়? কি দারুন জায়গা। শুনে অনুভব বলে, সব সময়ই তো কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখছি। তোমরা সিলারিগাঁও ডেলো কালিম্পং চটকপুর এসব বেড়াতে আসো। কিন্তু এই দৃশ্যটা যখন আমাদের সকাল সন্ধ্যা নিত্য ৩৬৫ দিন, আমাদের কাছে এটা গা সওয়া। আমার বরং মন পড়ে থাকে কবে কোন ছুটির সঙ্গে দুটো দিন ক্যাজুয়াল লিভ জুড়ে নিয়ে, একটা শনি রবি জুড়ে নিয়ে, হালিশহরের বাড়িতে ঘুরে আসব। সেখানে মা বাবা বউ বাচ্চা আছে। বললে তোমরা বিশ্বাস করবে না, আমি এখন পর্যন্ত এই চার বছরে কোনদিন কোথাও বেড়াতে যাইনি। একবার শুধু মা বাবা বউ-বাচ্চাকে নিয়ে এসেছিলাম এখানে। সপরিবারে কালিম্পং থেকে গেছে। চেনাজানা গাড়ি ও ড্রাইভার দিয়ে ওদের ঘুরতে পাঠিয়েছি এদিক ওদিক। 

অভিনব ঠিক কথাই বলেছে, অমন যে ভূস্বর্গ কাশ্মীর সেখানেও যদি কাউকে নির্বাসিত করা হয়, শাস্তি দিয়ে পাঠানো হয়, তখন আর ভূস্বর্গের ভ্রমণ আনন্দ থাকে না। ভূস্বর্গ হয়ে ওঠে কয়েদ খানা। আমার প্রথম পোস্টিং ছিল পুরুলিয়া। সেখানে ক্লাস রুম থেকে পড়াতে পড়াতে অযোধ্যা পাহাড়ের সম্পূর্ণ রেঞ্জটা দেখতে পেতাম। কিন্তু তিন বছরের চাকরিতে কোনদিন অযোধ্যা পাহাড় যাই নি। পরে বদলি হয়ে হুগলিতে আসার পর সপরিবারে অযোধ্যা পাহাড় বেড়াতে গিয়েছিলাম একবার। বেড়াতে যাবার আসল মজাটা তো আসলে, ধরা বাঁধা গতে বাঁধা জীবন থেকে ছুটি পাওয়া। তাই উঠোন সমুদ্র পার হলেই বেড়ানোর আনন্দ শুরু, শুধুই আনন্দ। কিন্তু পুরুলিয়ার দিনগুলোতে মনে আছে রবিবার সন্ধ্যেবেলায় ট্রেনের খাবার একটা হালকা ব্যাগে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে বেরিয়ে পড়া, ১০:৫০ এর আগ্রা চক্রধরপুর ধরা। উঠেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে একভাঁড় চা খেয়ে নেওয়া। ট্রেন ছাড়লে রাতের খাবার খেয়ে মাঠে টানটান হয়ে শুয়ে পড়া। সকালে ছাতনা স্টেশন এলে চায়ের ডাকে ঘুম ভাঙতো। ডাকটা এখনও কানে লেগে আছে। আবার চা খেয়ে ঘুম। তারপর আদ্রায় কোলাহলে জেগে ওঠা, ঠিক সাড়ে পাঁচটা। তারপর সাতটায় পুরুলিয়া। চেনা পরিচিত রিকশা ধরে আশীর্বাদ লজ, আমাদের মেস এ। কোথাও ভ্রমণের আনন্দ ছিল না। বাঁধা গতের চলন। 

লামাহাট্টা খুব সুন্দর প্রকৃতি, তখনো আনকাট সুন্দরী। পাহাড়ের গায়ে কাঠের তৈরি বাড়ি। মা বেটি জামাই, এই তিনজনের সংসার। তারাই একটা ঘর, প্রয়োজনে দুটো ঘরে হোম স্টে চালায়। ঘরের পেছনের দিকে সরু ফালি বারান্দা। তারপর সামান্য ফুট দশেক চওড়া খোলা উঠোন। সেখানে কাঠের আগুন জ্বেলে গরম জল, রান্না, বারবিকিউ সবই চলছে। উঠোন থেকে একধাপ নামলে সেখানে কিছু সবজির বাগান। বেগুন, কোয়াশ, লঙ্কা ইত্যাদি সাধারণ জিনিস। ওটাকে কিচেন গার্ডেন বলা চলে। নিজেদের মুরগি পালন আছে। বেশ লাগছিল। আর দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের মাঝে যে খাদ এঁকে বেঁকে গেছে সেখানে জমাটবাঁধা মেঘ কুয়াশা। মনে হচ্ছে এঁকে বেঁকে আসা মেঘ কুয়াশার নদী। কিন্তু এমন নিসর্গের মাঝে একটু হারিয়ে যাবো তার উপায় নেই। মনে হলো, ইস আমি এতো সুন্দর পরিবেশে আছি, আমার বাড়িটা যদি এখানে নিয়ে আসতে পারতাম। এই পরিবেশে আমার ছোট্ট অনাড়ম্বর বাড়িটা খুব মানানসই হতো।

ভাবতে পারবেন না, আমার বাড়ির হাতা খুন্তি শাঁড়াশি সব কিছুই আমার কাছে জীবন্ত। বিশেষ করে এখানে এসে ওদের প্রাণের পরশ খুব মিস করছিলাম। আমার বান্ধবী তো বেড়াতে গেলে নিজের কোল বালিশটা নিয়ে যায়। তাতে লাগেজ অনেক বড়ো হয় ঠিকই, তবুও নেয়। ও বলে, কত হাসি আনন্দ আহ্লাদ, কত দুঃখ, চোখের জল, সব কিছুর সাক্ষী এই কোলবালিশ। সম্ভবত আমার মা বাবা এমন কি আমার জীবন সঙ্গীও কেউ সব কথা জানে না। যা জানে এই কোলবালিশ। আর বেড়াতে গিয়ে আনন্দ করবো, এই বালিশ সাক্ষী থাকবে না? মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, এই ধরনের চরম আত্মিক বন্ধন নাকি অসুখ। একটা মাত্রা পর্যন্ত এই আত্মিক টান স্বাভাবিক। কিন্তু বেশি মাত্রায় হলে সেটা অবশ্যই অসুখ। জানি না, হবে হয়তো। 

যাই হোক লামাহাট্টার পর একদিন দার্জিলিঙে কাটিয়ে যখন মোটরগাড়ি ধরলাম এনজিপির উদ্দেশ্যে সেদিন মনটা কি দারুন আনন্দে আবেশে ভরে গেল। দুপুর দুটো আড়াইটা নাগাদ কোন একটা গাড়ি ধরেছিলাম। বোধহয় কামরূপ। এনজিপি থেকেই রাতের খাবার নিয়ে নিয়েছিলাম। রাতটা ভালো ঘুম হবে না জানতাম। খুব সকালে বলা যায় মাঝ রাতে ট্রেন পৌঁছাবে ব্যান্ডেল স্টেশন। সেখান থেকে লোকাল ট্রেন ধরতে হবে আমার বাড়ির স্টেশনের উদ্দেশ্যে। বিশ্বাস করুন বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ এবং উন্মাদনা নিয়ে বেরিয়েছিলাম বাড়ি থেকে। গেট থেকে বেরিয়েই শুরু হয়েছিল আমার ভ্রমণ। আর এনজিপি থেকে ট্রেন ধরার পর, আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে দার্জিলিং থেকে মোটরগাড়ি চেপে এনজিপি-র উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার পর, সেই একই রকম বিচিত্র ভালোলাগা আমাকে গ্রাস করেছিল।

প্রায় রাত্রি আড়াইটা তিনটে নাগাদ ব্যান্ডেল পৌঁছেছিলাম। তারপর প্রথম ব্যান্ডেল হাওড়া লোকাল সম্ভবত তিনটের সময়। ব্যান্ডেল স্টেশনে একটু চা খেয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ফাঁকা ফার্স্ট ট্রেনের একটা কামরায় উঠে পরম নিশ্চিন্তে বসে আছি। সময় মত ট্রেন ছাড়লো। এসে পৌঁছল আমার হোম স্টেশনে। এত সকালে আমার প্রতিদিনের সারথিকে পাবো না। কারণ তখন মোবাইলের যুগ ছিল না। আর থাকলেও আমার মোবাইল ছিল না। অতঃপর স্টেশন থেকে একটা রিকশা ধরে একটু হালকা সবজি বাজার করলাম ভোরের তরতাজা সবজির বাজার থেকে। তারপর বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। আসলে আমি পথে একটু সময় কাটাচ্ছিলাম। সাত সকালে অভিমন্যু কে ডাকতে খুব সংকোচ হচ্ছিল। তবুও একান্তই বাধ্য হয়ে ওকে ডাকলাম। দেখলাম ও রেডি হয়েই ছিল। কারণ আগের দিন সকালে দার্জিলিং ছাড়ার সময়ে বাড়িতে এসটিডি করে জানিয়েছিলাম, খুব ভোর নাগাদ আমরা পৌঁছে যাব। ফলে ও সকাল সকাল উঠে বিছানা ঘরদোর গুছিয়ে রেখেছে। বললাম বাড়ির লোকদের আনোনি? ও বলল, দুদিন এনেছিলাম। সবাই মিলে খুব আনন্দ করেছি। 

আমি এ ঘর, ও ঘর, করে গোটা বাড়িটাকে রান্নাঘরটাকে যেন আমার উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলাম। আর তারাও আমাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। বাড়িটা যেন আমার কাছে আরও নতুন করে বড় বেশি আপন হয়ে উঠেছিল। যেন অভিমান করে জানালার পর্দা থেকে ক্যালেন্ডার, ঘড়ি, হাতা, খুন্তি, জলের মগ, সকলেই আমাকে শুধাচ্ছে -- আমাদের ছেড়ে এতদিন কোথায় ছিলে? কি করেই বা ছিলে? মনে পড়ল দূরদর্শনে দেখা একটি বিজ্ঞাপনের ক্যাচ লাইন, একটা পেইন্ট কোম্পানির বিজ্ঞাপন - "ঘরও কিছু কথা বলে"। ঠিক তখনই মনে পড়ছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সেই কবিতা :
পুকুর, মরাই, সবজি-বাগান, জংলা ডুরে শাড়ি,
তার মানেই তো বাড়ি।
তার মানেই তো প্রাণের মধ্যে প্রাণ,
নিকিয়ে-নেওয়া উঠোনখানি রোদ্দুরে টান্‌-টান্‌।
ধান খুঁটে খায় চারটে চড়ুই, দোলমঞ্চের পাশে
পায়রাগুলো ঘুরে বেড়ায় ঘাসে।
বেড়ালটা আড়মোড়া ভাঙছে; কুকুরটা কান খাড়া
করে শুনছে, কথা বলছে কারা।
পুবের সূর্য পাশ্চিমে দেয় পাড়ি,
দুপুরবেলার ঘুমের থেকে জেগে উঠছে বাড়ি। 

একঘেয়ে বিরক্তিকর জীবনটা যে আসলে এত প্রিয় ভালোলাগার বস্তু, এটা নতুন করে উপলব্ধি করছিলাম। "তোমায় নতুন করে পাবো বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ।" গতানুগতিক জীবনটা আছে বলেই ভ্রমণে এত আনন্দ। আর ভ্রমণটা থাকে বলেই গতানুগতিক জীবনটা নতুন থেকে নতুনতর হয়ে ধরা দেয়। তখনই মনে পড়লো সুভদ্রা আর অতনুরা কি পুরো দুমাস অপেক্ষা করেছে? নাকি সপ্তাহ ফুরাতে না ফুরাতেই দুজনেই হাঁপিয়ে উঠেছিল, কাছাকাছি পাশাপাশি, কথা বলা, খুনসুটি করার জন্য? কে জানে! হবেও বা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

মোট পৃষ্ঠাদর্শন