সঞ্চিতা বিশ্বাস
সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলন। এক উত্তাল জঙ্গলমহল। নদী যেমন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও উর্বর পলিমাটি রেখে যায়, তেমনি এক একটা বিপ্লব বা বিদ্রোহ নিয়ে আসে নতুন দিক। তাই বলে জঙ্গলমহল মানেই কেবল সংগ্রাম আর লড়াইয়ের ইতিহাস? না, তা নয়। যেমন প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ আছে তেমনি আছে নিজস্ব সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা। রূপে-রসে-গন্ধে সৌন্দর্যের অপূর্ব বাহার। রাস্তার দুধারে শুধুই শাল পিয়ালের ঘন জঙ্গল। এই পথে কয়েক মাইল হেঁটে গেলেও ক্লান্তি আসে না। এইখানেই পথ হারালাম।
প্রণাম, অরণ্যদেব, প্রণাম !
পেরিয়ে এলাম দামোদর- দ্বারকেশ্বর। বামে গোঁসাইপুর রেখে বিষ্ণুপুর-গোপালপুর রোড ধরলাম। আর একটু এগোলেই উগ্রচন্ডির মন্দির। কত কী ভাবনা ভিড় করে আসছে মাথায়। কত কী ভাবনা দানা বাঁধছে, গুড়িয়ে যাচ্ছে, আবার দানা বাঁধছে। যত এগোচ্ছি জঙ্গল গভীর হচ্ছে।
' এই রাস্তাটা কোনদিকে গেছে ? '
মাইলখানেক চলার পর ঠাহর হলো পথ হারিয়েছি। এই এক স্বভাব আমার ছেলেবেলা থেকেই। ভুল করলেই একটু দাঁড়িয়ে যাওয়া। সুতরাং একটা ছোট্ট বিরতি।
জঙ্গল তো আগেও দেখেছি কিন্তু এবারই আমার মনে হলো এই জঙ্গলে যেমন দুঃখ আছে, আশা আছে, হতাশা আছে , তেমনি আছে আনন্দ। ছায়াঘেরা বন, জঙ্গল, ক্যানাল, নদী। তারই মাঝে পরম নিশ্চিন্তে জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের বাস। এই পথগুলো যদি আমার সব চেনা থাকতো...
যাহোক করে রাস্তা পাওয়া গেল। বিষ্ণুপুর-আরামবাগ রাজ্য সড়ক। বেশ জাঁকিয়ে মেঘ করেছে। টুপটাপ পড়ছেও। ওসব তোয়াক্কা না করেই এগোলাম। দু'পাশে কয়েক কিলোমিটার জায়গা জুড়ে জয়পুর জঙ্গল। যতদূর চোখ যায় কেবল গাছ আর গাছ। নিশ্চুপ বন। থেকে থেকে ভেসে আসছে অচেনা সব পাখির ডাক।
'ও ভাই, শোনো না, ব্রিটিশ আমলের এয়ারবেসটা কোনদিকে বলতে পারো?'
'সোজা গিয়ে বামে বা ডানে, তবে বামদিকের রাস্তাটা একটু খারাপ , যদিও অসুবিধে নেই'
এগোলাম, কেমন যেন মনে হচ্ছে গুপ্তধনের সন্ধানে এগোচ্ছি, সেই ছড়াটা মনে পড়ে গেলো -
' তেঁতুল বটের কোলে , দক্ষিণে যাও চলে '
বামদিক ধরে খানিক এগোতেই আরও ঘন জঙ্গল। এখানে রোদ উঁকি দিচ্ছে। সামনেই রেললাইন , ছোট্ট ব্রীজ, তার নীচ দিয়েই লালমাটির রাস্তা। কিন্তু এই যা! জলে জলাকার। লাল দইয়ের উপর জল কাটলে যেমন দেখায় ঠিক তেমন!
জনমানবহীন শুনশান পথ। চোখে পড়লো এক পেল্লায় জলাশয়। পাশেই উঁচু এক ঢিবি। একটু বসা যাক। স্থানীয় একজন সাইকেল নিয়ে জঙ্গলের পথ ধরে ফিরছেন, সঙ্গে সহধর্মিনী। আঞ্চলিক টানে কথা বলছেন, মিচকি মিচকি হাসছেন। নগরসভ্যতা থেকে এতখানি দূরে কী সহজ যাপন, কত সহজ প্রেম! ওদেরকে দেখে চোখের কোণে জল এলো। আহা জীবন!আহারে জীবন!
পরবর্তী পথ ওরাই দেখালো। ব্রিটিশ এয়ারফিল্ড স্থানীয়দের কাছে চাতাল নামেই পরিচিত। শুনেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ সরকার এমন কিছু বিমান ঘাঁটি বানিয়েছিলেন যা আজও মানুষের অজানা। এখানে এই জঙ্গলের মাঝে এই পিয়ারডোবা এমনই এক ঘাঁটি। এখান থেকেই জাপান ও অন্যান্য শক্রদেশে আক্রমণ চলতো। কালের যাঁতাকলে আজ সবই বিলীন।
রোদ ফিকে হচ্ছে। আবারও মেঘের ভ্রুকুটি। এইবারে তো ফিরতে হয়। কিন্তু গোকুলচাঁদ মন্দির! এ যাত্রায় আর হলো না। এই জঙ্গলে হিংস্র জন্তুর ভয় না থাকলেও বুনো হাতির দলবেঁধে ধেয়ে আসার কথা অনেকের মুখেই শুনেছি। অগত্যা চাকা ঘোরাতে হলো...
তবে এবারে কিন্তু পথ হারালে চলবে না । আসলে চারিদিকে এত মত আর এত এত পথ তাই পথ হারানোটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ঘরে তো ফিরতেই হবে। ওই যে কবিগুরু বলেছেন 'ছুটি আছে কেবল দুদিন'।
জঙ্গল কিছুটা হালকা হয়ে আসছে । গভীর থেকে অগভীর। মনে ভেসে আসছে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সেই কথা, ' জন্ম মৃত্যু বলে আসলে কিছু নেই বুড়ো, শুধু আছে গভীর থেকে অগভীরে ভেসে ওঠা আবার গভীরে তলিয়ে যাওয়া... '





