দোঁহা

কতনা ডুব

 


মালবিকা মিত্র

ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর। 
চাঁদ বুঝি ডুবে গেল ?—গব্ গব্ গ—বাস! 
ডুব ডুব ডুব ডুব সাগরে আমার মন।
আমায় ডুবাইলি রে আমায় ভাসাইলি রে। 

কতনা "ডুব" এর ভীড়ে আমার কাছে "ডুব" এই একটা শব্দে চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা গল্প। একটা ছবি, যা আমার চোখে আজীবন অমলিন, এই সত্তর বছর বয়সে পৌঁছেও। বরিশালের মোড়াকাঠী গ্রামে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটা খাল। সে খাল সরু নালা নর্দমা নয়। বেশ ভালো চওড়া খাল। সেখানে বড় নৌকো চলাচল করে। খালের ওপারে নমশূদ্র ও মুসলমানদের গ্রাম। এই খাল আরো কিছুদূর এগিয়ে গৌরনদী খালের সাথে যুক্ত হয়েছে। ওপারের সাথে এপারে যোগাযোগের সেতু কাঠের তৈরি। আমার বাবা ছিলেন ইউনিয়ন বোর্ডের সভাপতি, তার উদ্যোগে এই কাঠের সেতুটি মুসলমান নমশূদ্র পাড়াকে আমাদের এই বর্ণ হিন্দু পাড়ার সাথে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বেঁধেছিল। 

সেটা দেশভাগের ঠিক পর পরের সময়। ঘটনাটা হল গ্রামে তখন হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে একটু ভাঁটা পড়েছে। দু একজন লীগের মাতব্বর যারা "স" উচ্চারণ করে না "ছ" বলে। হজরত "ওসমান" কে বলে "উছমান"। কারণ আরবি ভাষায় "স" নেই। তারা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে "অগ তো ভেন্ন দ্যাশ হইছে। ওহানে যাইবো না ক্যান?" উদ্দেশ্য টা স্পষ্ট, আমরা ওখানে গেলে এই জমি জমা, বসতভিটা, ইউনিয়ন বোর্ডের কর্তৃত্ব, সবকিছু ওই মাতব্বরদের হস্তগত হবে। তবে এ নিয়ে অধিকাংশ মুসলমানের মাথা ব্যথা ছিল না। এই সব ডামাডোল, গ্রামের সম্প্রীতি বজায় রাখা, তাছাড়া বোর্ডের কাজকর্ম, সবকিছু নিয়েই আলোচনা করতে বাবা সেদিন ওপারের মুসলমান নমশূদ্র পাড়ায় গিয়েছিল। একটু সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। বাবা বাড়ি ফিরছে, সঙ্গে হাফেজ মিয়া। বাবা হাফেজদা কে বোঝাচ্ছেন, অত মাথা গরম করলে হবে? আখতার তো সদাই চায় একটা গোল বাধাইতে। গোল বাধলেই ওর পোয়াবারো। এইরকম সময় মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। ঠিক এই সময় উজ্জত আলী অন্ধকারে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জানালো, "লাঠি সড়কি নিয়া আখতারের লোকজন আইতাছে ঠাউর কর্তারে মারতে। মাইজ্যা ঠাউর, অহনি আপনে পালান।"

হাফেজ দাদার কাছে গল্প শোনা। বাবা তৎক্ষণাৎ পালানোর উপায় নেই দেখে খালে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বর্ষায় ভেসে আসা কিছু কচুরিপানা জড়ো করে, সেইখানে ডুব দিলো। শুধু নাকটা জলের ওপরে উঁচিয়ে রাখলো। আখতারের লোকেরা এসে খালের পাড়ে এদিক-ওদিক আস্ফালন করল। কিন্তু ততক্ষণে উজ্জত আলির লোকজন লাঠি সড়কি ল্যাজা বল্লম নিয়ে দূর থেকে আওয়াজ দিলো -- ভয় নাই মাইজ্যা কত্তাআআআ। আমরা আইছিইই। মুহূর্তে আখতারের গুন্ডার দল পিঠটান দিল। "ডুব" বলতেই এই আত্মগোপনের, নিরাপদ আশ্রয়টার কথা মনে পড়ে। ছবির মত চোখে ভাসে।

শুধুই তো নিরাপদ আশ্রয় আত্মগোপন নয়। সঙ্গে সঙ্গে "ডুব" দিই এক অতল আত্ম মগনে। বলা যায় স্মৃতির অতলে অবগাহন। যেখানে হাজারো মণিমুক্তার সম্ভার। "ভয় নাই মাইজ্যা কত্তাআআআ" শুধু তো কথার কথা ছিল না। তখন আমার বয়স বড়জোর চার কি পাঁচ আর দিদির সাত কি আট হবে। অন্য এক গ্রামে রবীন্দ্রজয়ন্তী হবে। মা দিদিকে আর আমাকে গান ছড়া শিখিয়ে, সাজিয়ে গুজিয়ে হাফেজ-দাদার সাথে পাঠিয়ে দিল। দিদি গাইবে "আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে" আর "চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে"। আমি ছড়া বলবো "মধু মাঝির ওই যে নৌকা খানা"। দিদি হাফেজ দাদার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে চলেছে। আর আমি হাফেজ দাদার কাঁধে ছড়া আউড়ে চলেছি। দাদা মানে কিন্তু কাকা, আমরা বলতাম দাদা। হ্যাজাক, ডে লাইট জ্বেলে সেখানে রবীন্দ্রজয়ন্তী হবে। তারপর সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত্রি। হাফেজদার সঙ্গেই আমরা ফিরছি। বাড়িতে মা কিন্তু এতোটুকু উদ্বিগ্ন না। তাই বলছিলাম "ভয় নাই মাইজ্যা কত্তাআআআ" আমাদের কাছে তো ছিলই, মায়ের কাছেও কথার কথা ছিল না, ছিল আস্থা আর ভরসার কথা। 

বেশ মনে আছে ছোটবেলায় আমার মারাত্মক প্রাণঘাতী ডিপথেরিয়া হয়েছিল। ডাক্তারবাবু ছিলেন গ্রামের ললিত শর্মা, যিনি আমাকে লালমদ্দি বলে ডাকতেন। কারন আমি ছিলাম ফর্সা মোটা লাল টুকটুকে। মনে আছে সারারাত ললিত ডাক্তার, বাবার বন্ধুরা আমার সেবায় রত। খালের ওপারে হাফেজ দাদা, মনিরুল কাকা, তারাও রাত জাগছেন আমাদের বাড়ি। বর্ষার রাত। এদিকে আমার টেম্পারেচার তখন পাঁচ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। ললিত ডাক্তার নাকি বলেছিলেন, শহর থেকে একটা ইনজেকশন আনাতে হবে। আমি ছিলাম সংজ্ঞাহীন। হাফেজ দাদা প্রতিবেশীকে সাথে নিয়ে ওই বর্ষার রাতেই খালে নৌকা ভাসালেন। শুনেছি সেই ইঞ্জেকশন আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল এবং তারপর আমার জ্ঞান ফিরেছিল ওই ইনজেকশনেই। এবার বলুন "ভয় নাই মাইজ্যা কত্তাআআআ" -- এটা কি শুধুই কথার কথা ছিল, নাকি পূর্ণ আশ্বাস আর বিশ্বাসের কথা। 

আমি জানি আমার এই আত্মমগণ অবগাহন এর কথা, স্মৃতির অতলে ডুব আমার কাছে মণিমুক্ত হলেও, কারো কাছে তো প্যাচাল মনে হতেই পারে। বিশেষত এই ডিজিটাল যুগে, গতির যুগে। তাই আর দীর্ঘ না করে একটা মাত্র গল্প বলি। দুগ্রাম পরে এক মেলা হতো। সেই মেলায় যাচ্ছি আমাদের দুই বোন, আর আমার খুড়তুতো পিসতুতো তিন ভাইবোন, সাকুল্য পাঁচজন। নিয়ে যাচ্ছে বাবার পিসি বাতাসি। বাগানের পথ ধরে নিয়ে চলেছে। পিসির মাথার ঠিক ছিল না। সে ছিল বদ্ধ উন্মাদ। মা একটু কিন্তু কিন্তু করেছিল পিসির সঙ্গে আমাদের ছাড়তে। কিন্তু পাগলী পিসির সাফ কথা "এরারে কি তুমি বাপের বাড়ি থেকে আনছো? আমাগো পোলা মাইয়া" -- ব্যাস, মায়ের আর কিছু বলার ছিল না। বাগানের পথে যেতে যেতে আমাদের এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে পিসি নিজে দিলেন "ডুব"। হ্যাঁ এটাও আর এক রকমের "ডুব" -- সশরীরে উধাও হওয়া। আমরা তো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, যখন পিসি কিছুতেই এলো না তখন জুড়ে দিলাম উচ্চস্বরে কান্না। ওই পথেই মেলা ফেরত জনাকয় মানুষ কান্না শুনে জঙ্গলের ভেতর আমাদের এসে আবিষ্কার করল। "আরে, দেইখ্যা তো ঠাওর হয় হ্যারা হক্কলে ঠাউর বাড়ির মাইয়া পোলা"। সেই গ্রামবাসীদের সাহচর্যেই অবশেষে বাড়ি ফেরা। হ্যাঁ এরাই তো প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারে, আস্থা জাগাতে পারে -- "ভয় নাই মাইজ্যা কত্তা, আমরা আইতে আছি"। 

এই প্যাঁচাল আর দীর্ঘ করলাম না বরং অন্য আলোচনায় "ডুব" দিই। আমার বেশ মনে আছে আমার দিদির ছেলে অনুষ্ঠান বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে খুব ভালোবাসতো। কোন বাড়িতে ওর নিমন্ত্রণ না থাকলেও আমরা ওকে নিয়ে যেতাম। মাম্মাম আর মশাই ওকে ছাড়া কোন নিমন্ত্রণে যেত না। আমাদের বিয়েতে কোন অনুষ্ঠান হয়নি। ফলে অ্যালবামে আমাদের বিয়ের কোন ছবিও ছিল না, ও দেখে নি কখনো। একদিন অ্যালবামে ওর মা-বাবার বিয়ের ছবি দেখে একটু রাগের স্বরে ও সুরে বলল "ওও তোমাদের বিয়ে হয়ে গেছে? ভেবেছিলাম তোমাদের বিয়ের নেমন্তন্নটা খাবো"। আমরা তো সবাই শুনে হেসে গড়িয়ে পড়লাম। তারপর ও নিজেই বলল ঠিক আছে, মাম্মামের বিয়ের নেমন্তন্নটা খাওয়া যাবে"। আমরা আরও মজা পেলাম। বললাম, হ্যাঁরে, মাম্মাম কাকে বিয়ে করবে? ও বলল, কেন মশাইকে। আরেক প্রস্থ হাসির ঢেউ। আমি বললাম "আর যাকেই বিয়ে করি তোর মশাই কে বিয়ে করবো না"।  শুনে ও বলল "এইটা আমি ঠিক জানি। তুমি মশাই কেই বিয়ে করবে। তুমি যে বলো হ্যাঁগো শুনছো। জানি মশাই তোমার বর হবে"। আমার দিদি শুনে হাসতে হাসতে বলল "এদিকে জ্ঞানের নাড়ি টনটনে। ব্যাটা ডুবে ডুবে জল খায়"। এ হলো আরেক "ডুব"। আপাতভাবে হাবাগোবা সাদাসিধে সরল, কিন্তু জ্ঞান বৃক্ষের ফলটি খেয়ে বসে আছে-- "মাম্মাম মশাইকেই বিয়ে করবে।মাম্মাম মশাইকে হ্যাঁগো ওগো বলে"। 

আলংকারিকভাবে "ডুব" এর কতনা ব্যবহার। বহু ক্ষেত্রেই বলতে শোনা যায়, সব দিক থেকে জলসা ভালই চলছিল কিন্তু মাঝে ওই বেসুরো আশা কন্ঠি শিল্পীটাই ফাংশন ডুবিয়ে দিল। অতিথি আপ্যায়নে কোন ত্রুটি ছিল না, নিখুঁত। কিন্তু খাবারের পাতে বাটার ফ্রাইয়ের বাসি ভেটকি মাছের গন্ধই সবটা ডুবিয়ে দিল। এও তো "ডুব"। পুরোপুরি ভেস্তে দেওয়া। 
একদম এই পর্যন্ত লেখাটা খসড়া পড়ে শোনাচ্ছিলাম বান্ধবীকে। বান্ধবী বলল, মোটামুটি তো এগোচ্ছিল। কিন্তু গোটা দেশজুড়ে যেভাবে বাংলা বাঙালি বাংলাভাষী বাংলাদেশী ও বাঙাল নিয়ে ঘৃণা বর্ষণ চলছে, সেটা ভুলে গেলে? আরএসএস নেতা বনশল স্পষ্ট ঘোষণা করছে, পশ্চিমবাংলার বিধানসভা নির্বাচন আর পাঁচটা রাজ্যের মত সাধারণ কোন নির্বাচন নয়। এটা একটি বিজাতীয় সভ্যতার বিরুদ্ধে ভারতীয় হিন্দু সভ্যতার এক বিজয় অভিযান। সুতরাং আরএসএস-এর চোখে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি সভ্যতা হলো বিজাতীয়। সেখানে তুমি শুরুতেই হাফেজ দাদা, মনিরুল চাচা, উজ্জত আলী, দিয়ে লেখাটাকে ডুবিয়ে দিয়েছো। "হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্তান" এই সূত্রায়নে মোদির ভারতে তোমার এই লেখাটা শুরুতেই ডুবে গেছে। 

বান্ধবী হয়তো ঠিক কথাই বলেছে। কিন্তু ও অন্য সম্ভাবনার কথা ভাবেনি। ১৮০৬ সালে রাশিয়ার সাথে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের টিলজিট চুক্তির পর তার সাফল্য ছিল শীর্ষস্থানে। উত্থান তখন সর্বোচ্চ শিখরে, নেপোলিয়ন ইউরোপ বিজয় সম্পূর্ণ করেছে এবং রাশিয়া নেপোলিয়নের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। সেই সময় ১৮০৬ সালেই স্পেনের মাটিতে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে জাতীয় অসন্তোষ ও প্রতিরোধ শুরু হলো। বলা যায় নেপোলিয়ন বোনাপার্টের একটা ছোট্ট ভুল পদক্ষেপ তাকে ডুবিয়ে দিল। স্পেনের শূন্য সিংহাসনে বসালেন নিজের ভাই জোসেফ বোনাপার্টকে। স্পেনবাসী নেপোলিয়নের এই সিদ্ধান্তকে মানতে পারল না। তারা শূন্য সিংহাসনে যুবরাজ ফার্ডিনান্ডকে বসাতে চেয়েছিল। নেপোলিয়নের গৌরব সূর্য এই সময় থেকেই পশ্চিমগামী হয়েছিল। মানে "ডুব" তে শুরু করেছিল। নেপোলিয়ন নির্বাসনে থাকাকালে নিজের আত্মজীবনীতে এই স্পেনীয় ক্ষতকে তার পতনের জন্য প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেছিলেন। শুধুমাত্র যোশেফ বোনাপার্টকে সিংহাসনে বসানোর একটা সিদ্ধান্ত তাকে ডুবিয়ে দিলো। কে বলতে পারে হয়তো আর এস এস ও মোদিজীর হিন্দু-হিন্দি হিন্দুস্তান গৌরব সূর্য এই বাংলা থেকেই ডুবতে শুরু করবে, হতেই তো পারে। 

মনে আছে, বিশ্বকাপ ক্রিকেটে মাইক গ্যাটিংয়ের একটা রিভার্স সুইপ অস্ট্রেলিয়ান উইকেট কিপার এর হাতে ধরা পড়ার পর, নিশ্চিত জেতা বিশ্বকাপটি ইংল্যান্ডের হাতছাড়া হয়েছিল। মাইক গ্যাটিংয়ের শেষ বিশ্বকাপ ছিল ১৯৮৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ, তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক এবং ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে রানার-আপ হয়। এই বিশ্বকাপের ফাইনালে অ্যাডিলেডে তার বিখ্যাত এবং বিতর্কিত রিভার্স-সুইপ শটটি ছিল তার অধিনায়কত্বের শেষ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর মধ্যে একটি, যা তার আউট হওয়ার কারণ হয়েছিল এবং ইংল্যান্ডের হারের জন্য দায়ী ছিল। তীরে এসেও তরি "ডুব"তে কতক্ষণ !

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

মোট পৃষ্ঠাদর্শন