নিশিভোজের উপাচার
সারাদিন নুন-ভাতের গ্লানি, আঙুলে হলুদের কষ।
তুমি ফিরলে- গায়ে বাইরের ধুলো আর কাঁচা মাংসের আঁশটে ঘ্রাণ।
বসলে ঠিক সেখানে, যেখানে মাছের আঁশ ছিটিয়ে থাকে।
আমি তো শিকারি নই, স্রেফ জাঁতাকলে পিষ্ট এক ঘরণী।
অথচ অবোধ আঙুল আজও তোমার পাঁজরের খাঁজে একটু নড়াচড়া খোঁজে।
তুমি বললে, ‘এক গ্লাস জল দাও’।
আমি বললাম, ‘আগে ডান হাতখানা দাও, চেখে দেখি।’
বাস্তব পাগল? কেউ কি নিজের হেঁশেলকে শ্মশান বানায়?
সংসার মানেই তো এক মেকি ভোজসভা,
যেখানে বঁটি দিয়ে কুচি কুচি করা হয় নিজের গোপন হাহাকার।
আমি তোমার ঘাড় থেকে শুরু করলাম। যেমন করে থোড় কাটি।
একটু একটু করে খুলে আসছে তোমার চামড়া, তোমার নাম-পরিচয়।
একটা কর্কশ শব্দ- যেন কড়াইতে একা ভাজা হচ্ছে চাল।
অথচ তোমার দু’চোখে তখনও অপার্থিব শ্রাবণ।
নইলে ফুরিয়ে যেতে যেতেও মানুষ এমন তৃপ্তিতে হাসে কেন?
খাওয়া শেষ। পরিপাটি বিছানায় তুমি নেই।
পড়ে আছে সামান্য নুন, কালচে রক্ত আর আমার ভাঙা চুড়ির কয়েকটা দাঁত।
আমি কি তোমায় ভালোবেসে খেয়ে ফেলেছি নাকি খেয়ে ফেলে ভালোবেসেছি?
এই গোলকধাঁধায় থুতু ফেলছে ডাস্টবিনে পড়ে থাকা আমাদের না-ফোটা ভ্রুণ।
ঘর এখন অন্ধকার।
শুধু আমার জঠরের ভেতর তুমি নড়াচড়া করছ।
শহরের রাস্তায় একা ঘোরার চেয়ে এই অন্ধকারে মিশে থাকা ঢের ভালো-
যেখানে আমিই তুমি,
আর তুমি আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া এক দীর্ঘ, অনন্ত বিষাদ।
সিলিং ফ্যান-এর সংসার
আমাদের বিবাদ শুরু হয়েছিল সিলিং ফ্যানের আওয়াজ থেকে।
তুমি বললে, “গরম লাগে,”
আমি বললাম, “ঘুমটা আজও ভাঙে।”
কথাটা ওখানেই মরতে পারতো-
কিন্তু তুমি যেভাবে মুখ ফেরালে,
মনে হলো অভিযোগটা তোমার শরীরের বিরুদ্ধে।
সেদিনই বুঝেছিলাম,
একই ছাদের নিচে আমাদের রক্তচাপ আলাদা,
আমাদের তাপমাত্রাও এক নয়।
এখন তুমি আর নাম ধরে ডাকো না,
বলো- “এই যে" “শোনো”
যেন নাম উচ্চারণ করলে কাঁচের কিছু ভেঙে পড়বে।
মাঝরাতে তোমার পিঠের দেওয়ালে আমি হাত রাখি না,
শুধু দূর থেকে মেরুদণ্ডের সিঁড়ি গুনতে থাকি-
একসময় যে পথে আমি তোমার হৃদয়ে উঠতাম,
এখন সেই সিঁড়ি ঝরছে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে।
আলমারিতে কোনো কঙ্কাল নেই।
আছে কয়েকটা ইস্ত্রি করা রোববারের জামা-
পরা হয় না, অথচ বাতিল করার সাহসও নেই কারও।
ডিভোর্সের কাগজটা কাল এসে পড়বে,
তুমি ওটা রাখবে, চায়ের কাপের বলয়চিহ্নের পাশে,
আমাদের নীরবতার সঙ্গে।
যেন ওটা বাজারের ফর্দ, কিংবা কোনো পুরনো ইলেকট্রিক বিল।
আমি সই করব, কলমটা মুহূর্তের জন্য থমকে যাবে-
এই আঙুলগুলোই একদিন তোমার পিঠে তেল মাখিয়ে দিত।
প্রেম তখন মরেনি, শুধু খুব ক্লান্ত ছিল।
বিচ্ছেদ কোনো শব্দ নয়।
বিচ্ছেদ কোনো বিস্ফোরণও নয়।
বিচ্ছেদ- ওই সিলিং ফ্যানের একটানা ঘুঘুর ডাক,
যা আমাদের কাউকেই আর ঘুম পাড়ায় না।
